৪ কার্তিক ১৪২৪, বৃহস্পতিবার ১৯ অক্টোবর ২০১৭, ৩:০৮ অপরাহ্ণ
bangla fonts
facebook twitter google plus rss
Natun Somoy logo

৫২, ৫৩ ওয়ার্ড দেখে বিস্মিত ডিএসসিসি মেয়র!


০৮ অক্টোবর ২০১৭ রবিবার, ০৯:৫৬  এএম

ইমদাদুল হাসান রাতুল

নতুনসময়.কম


৫২, ৫৩ ওয়ার্ড দেখে বিস্মিত ডিএসসিসি মেয়র!

নানা সমস্যায় জর্জরিত রাজধানী ঢাকা। এগুলোর মধ্যে অন্যতম জলাবদ্ধতা। তবে রাজধানীর অন্যান্য এলাকার তুলনায় এই সমস্যায় নাভিশ্বাস উঠেছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) ৫২ ও ৫৩ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দাদের।

অনেকদিন ধরেই বছরের বেশির ভাগ সময় কালো, নোংরা পানির মধ্যে বসবাস করছেন এখানকার বাসিন্দারা। আর এমন পরিবেশে তাদের বসবাস চিত্র দেখে আশ্চর্য হয়েছেন খোদ মেয়র।

২৫ বছর ধরে ৫২ নম্বর ওয়ার্ডে থাকেন আনন্দ মল্লিক। ৩৯/এ মুরাদপুর, মাদ্রাসা রোডের আনন্দ কনফেকশনারির মালিক তিনি। নিয়মিতই ট্যাক্স পরিশোধ করা আনন্দ মল্লিক নতুন সময়কে বলেন, এই এলাকায় ১২ মাসই পানি আটকা থাকে। গেল কয়েক বছরে রাস্তাঘাটসহ অনেক কিছুরই উন্নতি হয়েছে। কিন্তু এই সমস্যার কোনো সমাধানই হয়নি।

২৩৩ হাজী লালমিয়া সরদার রোড, মুরাদপুরের বাসিন্দা সুরাইয়া বেগম অনেকটা ক্ষোভের সঙ্গেই বলেন, ‘লেইখা কী করবেন!’ বহুত সাংবাদিক আইছে, লেখছে। কিন্তু কোনো লাভ হয়নি। পানির জায়গায় পানি রইছেই।’

৭৫/এ মুরাদপুরের বাসিন্দা আমেনা বেগম। ষাটোর্ধ্ব বয়সের এই নারী এখানেই থাকেন। এটাই তার পৈতৃক ও স্বামীর বাড়ি। ১ অক্টোবর নিজের অভিজ্ঞতার কথা বর্ননা করে তিনি বলেন, ‘ওইদিন এক রিকশাওয়ালাকে বললাম, বাড়ির সামনে নামিয়ে দিতে। ১০ টাকার ভাড়া ১০০ টাকা দেবো, বললাম। তাও রিকশাওয়ালা গেল না। পরে এই নোংরা পানিতেই হেঁটে হেঁটে বাড়ি ফিরলাম।’

১৫ নম্বর মুরাদপুর, মাদ্রাসা রোডে থাকেন সুমন হাসান। তিনি বলেন, ‘বৃষ্টি হলেও রাস্তায় পানি থাকে, না হলেও থাকে। পানি যে কতটা নোংরা, তা তো নিজের চোখেই দেখতে পারছেন।’

১৯৯/১ ভবন বাগিচা বাড়িটির মালিক মো. আব্বাস। প্রায় ১৫ বছর ধরে এখানে বাস করছেন তিনি। তিনি বলেন, আমার বাড়ির এখানটা একটু উঁচু। তাই, ১২ মাস নয়, চার থেকে সাত মাসের মতো পানি থাকে। কিন্তু বাড়ি থেকে দুই মিনিট দূরত্বেও রাস্তায় বলতে গেলে ১২ মাসই পানি থাকে। ফলে, আমাদেরও ১২ মাসই জলাবদ্ধতার ভোগান্তি পোহাতে হয়।

ডিপটির গল্লিতে থাকেন আলেয়া বেগম। পোস্তগোলায় একটি গার্মেন্টসে কাজ করেন তিনি। তিনি বলেন, ‘এই পানি পাড়াইয়া কাজে যাই। আবার বাসায় ফিরি। প্রায় বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হই। বেশির ভাগ সময়ই চর্মরোগে ভুগি।’

এত সমস্যার পরও কেন এখানে থাকেন এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এখানে বাসা ভাড়া কম। অন্যদিকে বেশি। তাই, কষ্ট হলেও এখানেই থাকি।’

পশ্চিম জুরাইন মুরাদপুর, মুরাদপুর ১,২,৩, ও ৪ মিলে ডিএসসিসির ৫২ ও ৫৩ নম্বর ওয়ার্ড। মেডিকেল রোড থেকে শুরু করে মাদ্রাসা রোডের শেষ মাথা পর্যন্ত ডিএসসিসি’র এলাকা। এরপর দনিয়া ইউনিয়ন। অন্যদিকে, শ্যামপুর ইউনিয়ন। এই এলাকা দুটির পানি ইউনিয়ন হয়ে ডিএনডি বাঁধে যায়। তবে পানি বের হওয়ার রাস্তা অর্থাৎ খাল দখল হয়ে যাওয়ার পাশাপাশি ময়লা-আবর্জনা পূর্ণ সরু ড্রেন ও পানি সেচের পাম্প প্রায়ই অকেজো থাকে। সে কারণে বছরের অন্তত ৯-১০ মাস এখানে জলাবদ্ধতা স্থায়ীভাবে থাকে।

ডিএনডি বাঁধের অন্তর্ভুক্ত এই পুরো এলাকাটি ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জের তিনটি সংসদীয় আসনে পড়েছে। এসব আসনের এই সমস্যার সমাধানে যৌথভাবে উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। সম্প্রতি, সেনাবাহিনীকে একটি কাজের টেন্ডারও দেওয়া হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, অক্টোবর মাসের ১৫ তারিখে সেনাবাহিনী প্রায় ৫৫৮ কোটি টাকার একটি প্রকল্পের কাজ শুরু করবে। ডিএসসিসি পুরো এলাকার রাস্তাঘাট ও ড্রেনজসহ অন্যান্য উন্নয়নমূলক কাজের জন্য ৭৩৩ কোটি টাকার একটি প্রকল্পের কাজ শুরু করেছে। এছাড়া দুই কোটি ৯৬ লাখ টাকা ব্যয়ে ওয়াপদা থেকে মাটি উত্তোলন ও সংশ্লিষ্ট একটি প্রকল্পের কাজ চলছে। এই কাজগুলো শেষ হলে ৫২ ও ৫৩ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দাদের দুর্দশা অনেকটাই লাঘব হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
৫২ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর নাসিম মিয়া নতুন সময়কে বলেন, ‘বছরে ৭০ লাখ থেকে সর্বোচ্চ এক কোটি টাকা বরাদ্দ পাই। এ দিয়ে কি জলাবদ্ধতার সমাধান করা সম্ভব! ৫২ ও ৫৩ নম্বর ওয়ার্ডেও জলাবদ্ধতার কারণ পানি বের হওয়ার রাস্তা নেই। রান্না, গোসল ও টয়লেটে ব্যবহৃত পানি সব একত্রিত হয়ে এখানে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি করে। আর বৃষ্টি হলে তো কথাই নেই।’

এই কাউন্সিলরের মত, ৫৩ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর নূর হোসেনের মতামতও একই। ডিএনডি বাঁধের সমস্যার সমাধান না হলে এই দুই ওয়ার্ডের বাসিন্দাদের জলাবদ্ধতার কোনো সমাধান হবে না বলে মনে করেন তিনি।

ডিএসসিসি’র এই দুই ওয়ার্ডে প্রায় তিন লাখ বাসিন্দা বাস করেন, যাদের বেশির ভাগই নিম্ন ও নিম্নমধ্যবিত্ত শ্রেণীর। প্রায় আড়াই বছর হয়েছে বর্তমান মেয়র ও কাউন্সিলরদের। বর্তমান মেয়র সাঈদ খোকেন আসার পর এখানে রাস্তায় এলইডি লাইট লেগেছে। রাস্তাগুলো উঁচু হয়েছে। গ্যাস ও পানির সমস্যারও অনেকটাই সমাধান হওয়ার কথা বলেছেন জনপ্রতিনিধি ও বাসিন্দারা। কিন্তু জলাবদ্ধতার কোনো উন্নতি হয়নি। সময়ের পরিক্রমায় অবস্থার উন্নতি না হওয়ায় ভোগান্তি সহ্য ক্ষমতার বাইরে চলে যাচ্ছে বলে জানান বাসিন্দারা। এমন পরিবেশে বসবাস করায় রোগ-ব্যাধি লেগেই থাকার কথাও জানিয়েছেন অনেকেই।

বাসিন্দাদের এই ভোগান্তি সম্পর্কে কাউন্সিলর বলেন, পানি যে কতটা কালো ও নোংরা, তা শুধু চোখে দেখেই বোঝা যায়। এমন পরিবেশ বছরের বেশিটা সময়ই থাকে। তবে সরকার ও মেয়র এই দুই ওয়ার্ডের জন্য বেশ আন্তরিক।

ডিএসসিসি’র মেয়র সাঈদ খোকনকে উদ্ধৃত করে ৫২ নম্বর কাউন্সিলর নাসিম মিয়া বলেন, ‘এই দুই ওয়ার্ডের বাসিন্দাদের বসবাসের পরিবেশ দেখে আশ্চর্য হয়েছেন মেয়র। এমন নোংরা পানির মধ্যে কীভাবে যে মানুষ বসবাস করে, তা দেখে সত্যিই তিনি আশ্চর্য হয়েছেন।’

জলাবদ্ধতার সমাধান প্রসঙ্গে ডিএসসিসি’র এই কাউন্সিলর বলেন, ডিএসসিসি ১৭ সেপ্টেম্বর ১১ কোটি ৯৬ লাখ টাকার একটি প্রকল্পের টেন্ডার দিয়েছে। এই কাজ শেষ হতে ১০ মাসের মতো সময় লাগবে। এছাড়া প্রায় তিন কোটি টাকা ব্যয়ে ওয়াপদায় একটি কাজ হচ্ছে। ড. আওলাদ হোসেন প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে বিশেষভাবে এই কাজের বরাদ্দ এনেছেন। এটি শেষ হতে সময় লাগবে প্রায় ছয় মাস। এই কাজ দুটি হলে দুই ওয়ার্ডের বাসিন্দাদের দুর্দশা কিছুটা লাঘব হবে। এছাড়া ডিএনডি বাঁধসহ পুরো এলাকায় প্রায় ১,৩০০ কোটি টাকার কাজ হবে। তখন জলাবদ্ধতার স্থায়ী সমাধান মিলবে বলেও আশা করেন স্থানীয় কাউন্সিল।

নতুনসময়.কম এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আপনার মন্তব্য লিখুন: