৪ কার্তিক ১৪২৪, শুক্রবার ২০ অক্টোবর ২০১৭, ৩:৪৩ পূর্বাহ্ণ
bangla fonts
facebook twitter google plus rss
Natun Somoy logo

সব সাফল্য কী অনুসরণযোগ্য!


০৮ অক্টোবর ২০১৭ রবিবার, ০১:১৪  পিএম

ডা. সাজ্জাদ হোসেন সুমন

নতুনসময়.কম


সব সাফল্য কী অনুসরণযোগ্য!

কয়েকদিন ধরে একটা শ্রেণি রীতিমতো জোর-জবরদস্তি করে যেভাবে `অনুপ্রেরণার গল্প’ হিসেবে একটি মেয়ের `মিস ওয়ার্ল্ড বাংলাদেশ’ হওয়াটাকে ফোকাসে এনে গুণকীর্তন করছে, তা দেখে যে কারোরই মনে খটকা জাগতে পারে। যেন তেন ভাবে সফল হলেই কি কাউকে রোল মডেল বলা যায়? সব সাফল্যই কি অনুসরণযোগ্য?  

অনেক বোধ বুদ্ধি সম্পন্ন, সচেতন, লেখাপড়া জানা মেয়েদেরকেও সাফল্যের, সংগ্রামের উদাহরণ হিসেবে এই অর্জনটাকেই দেখানোর চেষ্টাটুকু দেখে মনে হতে পারে আমাদের দেশের মেয়েরা জানেই না এদেশে কত অসাধারণ সব নারী রোল মডেল আছেন, যারা ঈশ্বর প্রদত্ত চেহারা বা চামড়া দেখিয়ে না, মাথার খুলির ভেতর যে মগজটা আছে, সেটা কাজে লাগিয়ে দেশ-বিদেশে বহু সুনাম কুড়িয়েছেন, সম্মানিত হয়েছেন।

সমস্যা হলো, তাদের সংগ্রাম, সাফল্যের খবর ভাইরাল হয় না!

আমাদের দেশের মেয়েদের কয়জন আয়েশা আরেফিন টুম্পার নাম শুনেছেন? 

যে মেয়েটি ন্যানো টেকনোলজি কাজে লাগিয়ে কৃত্রিম ফুসফুস আবিষ্কার করে চিকিৎসা বিজ্ঞানের জগতে রীতিমত হুলুস্থুল লাগিয়ে দিয়েছেন! ইউনিভার্সিটি অব নিউ মেক্সিকোতে ন্যানো-সায়েন্সের ওপর ডক্টরেট করতে থাকা মেয়েটি একই সাথে লস আলামস ন্যাশনাল ল্যাবেরটরিতে মানুষের মস্তিষ্কের রক্ত সংবহনের মডেল তৈরি করে ব্রেইন স্ট্রোকের কারণ অনুসন্ধান বিষয়ে গবেষণা কর্ম চালিয়ে যাচ্ছেন। তার এইসব গবেষণা হাজার হাজার মানুষের জীবন বাঁচাবে হয়তো ভবিষ্যতে, অথচ তাকে নিয়ে দুইটা লাইন কেউ কোথাও লিখবে না। 

চিকিৎসা ক্ষেত্রে দেশেও নারীদের অবদান কি কম? আইসিডিডিআরবি, ঢাকা; পেটের অসুখ নিরাময়ে সারা দুনিয়ায় সুনাম কুড়ানো বিখ্যাত প্রতিষ্ঠান। এই প্রতিষ্ঠানের ফেরদৌসী কাদরির সংক্রামক ব্যাধির গবেষণাকাজকে সম্মান জানিয়েছে দ্য ওয়ার্ল্ড একাডেমি অব সায়েন্স। একই প্রতিষ্ঠানের রুবানা রকিব ফুসফুস বহির্ভূত যক্ষ্মা রোগ নির্ণয়ের কৌশল আবিষ্কার করে সারা বিশ্বে খ্যাতি কুড়িয়েছেন। আর সেখানকারই আরেক গবেষক আয়েশা মোল্লাকে বাংলাদেশ উইমেন সায়েন্টিস্টস অ্যাসোসিয়েশন সেরা বিজ্ঞানীর পুরস্কার দিয়েছে চালের গুঁড়া দিয়ে মারাত্মক ডায়রিয়ায় কার্যকর স্যালাইন আবিষ্কারের জন্য। এই বিজ্ঞানী, গবেষকরা নীরবে নিভৃতে কাজ করে যাচ্ছেন মানুষের জীবন বাঁচাতে। তারা কেন মেয়েদের রোল মডেল হবেন না? কেন তাদের এই পরিশ্রম গবেষণার কাজ, সাফল্য সামনে নিয়ে আসা হচ্ছে না?

চিকিৎসা থেকে এবার খাদ্যে আসা যাক। বিরি  (BIRI) হলো আমরা যে দুই বেলা পেট ভরে ভাত খাই, সেটা যে ধান থেকে আসে, সেই ধান নিয়ে গবেষণার সবচেয়ে বড় প্রতিষ্ঠান। সেটির উদ্ভিদ প্রজনন বিভাগের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা কিন্তু একজন নারীই, তমাল লতা আদিত্য। তার হাত ধরে বাংলাদেশের কৃষক পেয়েছেন ১০টি নতুন জাতের ধান। এর মধ্যে আছে ব্রি-৫৮, বাংলামতি, সরু বালাম ও ব্রি-৭০। 

তিনি একবার এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘আমি এমন কিছু করতে চেয়েছি, যা আমাকে দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের কাছে পৌঁছে দেবে। দিনাজপুর থেকে নালিতাবাড়ী, যেখানে আমার ধান বোনা হয়েছে, সেখানে ছুটে গেছি।’ অনুপ্রেরণা হিসেবে এটি কি যথেষ্ট নয়?

এখানেই শেষ নয়- ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণরসায়ন ও অনুপ্রাণ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক হাসিনা খান পাটের জীবনরহস্য উন্মোচনের কাজে যুক্ত ছিলেন। একই বিভাগের অধ্যাপক জেবা ইসলাম সেরাজের নেতৃত্বে সম্প্রতি আবিষ্কৃত হয়েছে লবণসহিষ্ণু ধান। কি অসাধারণ অর্জন! এছাড়াও বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিজ্ঞানী রহিমা খাতুনের নেতৃত্বে আবিষ্কৃত হয়েছে দেশি পাট-৭, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব নিউক্লিয়ার এগ্রিকালচারের (বিনা) বিজ্ঞানী শামসাদ বেগম আবিষ্কার করেছেন গ্রীষ্মকালীন টমেটো। এগুলো কি বলার মতো ও অনুপ্রেরণা নেওয়ার মতো সাফল্য নয়? 

শুধু কৃষি আর মেডিকেল বেশি এক্সাইটিং লাগছে না? হাউ এবাউট এপ্লায়েড ফিজিক্স? সেই ১৯৭৫ সালে ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনে এই বিষয়ে পিএইচডি করতে যান বাংলাদেশের মেয়ে শাহিদা রফিক। তারপর তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফলিত পদার্থবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন। বিখ্যাত ডায়মন্ড রিসার্চ ল্যাবে তাদের আবিষ্কার এখনো কাজে লাগাচ্ছেন বিজ্ঞানীরা! 

বুয়েটেরই আরেক শিক্ষক ও গবেষক তানজিমা হাশেম ২০১৭ সালের ওডব্লিউএসডি-এলসেভিয়ার ফাউন্ডেশন পুরস্কারের জন্য মনোনয়ন পেয়েছেন। উন্নয়নশীল দেশগুলোর নারী বিজ্ঞানীদের সংগঠন ওডব্লিউএসডি এই পুরস্কার দিয়ে থাকে। তিনি মানুষের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা সুরক্ষার কম্পিউটার নির্ভর একটি উপায় বের করেছেন। অনলাইনে বিভিন্ন সেবা নেওয়ার সময় স্বাস্থ্য, অভ্যাস ও অবস্থানের বিষয়ে ব্যক্তিগত তথ্য গোপন রাখার জন্যই এ রকম ব্যবস্থার প্রয়োজন। 

শিক্ষা গবেষণা থেকে ব্যবসার দিকে যাই। মেয়েরা শুধু চাকরি করবে কেন? মেয়েরা চাকরি দিতে পারে না? ‘টেকম্যানিয়া’ ‘টিম ইঞ্জিন’ ‘ডিক্যাস্টালিয়া ডটকম’ এ তিনটি প্রযুক্তি নির্ভর প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা কারা জানেন? তিনজনই নারী। তসলিমা মিজি, সামিরা জুবেরী হিমিকা ও সাবিলা ইনুন। তাদের প্রতিষ্ঠানে এখন অন্যরা চাকরি করের। বাংলাদেশ উইমেন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (বিডব্লিউসিসিআই) প্রতিষ্ঠাতা ও বর্তমান সভাপতি সেলিমা আহমদ, যিনি একই সাথে নিটল নিলয় গ্রুপেরও ভাইস চেয়ারম্যান। সম্প্রতি তিনি অসলো বিজনেস শান্তি পুরস্কার পেয়েছেন। ২০১২ সালে তিনি সেরা নারী উদ্যোক্তা হিসেবে ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক পুরস্কারও পান। এই নারী উদ্যোক্তা দীর্ঘদিন দেশে নারী উদ্যোক্তাদেরকে উৎসাহ ও প্রয়োজনীয় সহায়তা দিতে কাজ করছেন। বাংলাদেশের এসব  নারী উদ্যোক্তা নিয়ে খবর বেরোয় আমেরিকার পত্রিকায়! বিদেশিরা বাংলাদেশের কীর্তিমান নারীদের পুরস্কার দেয় ও সম্মানিত করে। 

বাংলাদেশের আরোও অনেক নারী মেধা, পরিশ্রম,  দৃঢ় সংকল্প ও  মানবিকতা দিয়ে সফল হয়েছেন। তাদের এসব সাফল্য সময়ের সাথে মুছে যাবে না। বয়সের আঘাতে কুৎসিত হবে না। তারা পাইলট হচ্ছেন, সেনাবাহিনীতে কমিশন্ড অফিসার হচ্ছেন, চৌকস পুলিশ অফিসার হচ্ছেন ও বড় বড় প্রতিষ্ঠানের সর্বোচ্চ পদে বসছেন। আমাদের মেয়েরা মেধায়-মননে ও পরিশ্রমে কোনো দিক থেকেই পিছিয়ে নেই। এখন দরকার শুধু তাদের স্যফল্যকে ব্যাপক প্রচারিত করে সবার সামনে নিয়ে আসা।

 

লেখক: চিকিৎসক

নতুনসময়.কম এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আপনার মন্তব্য লিখুন: