৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৫, সোমবার ২১ মে ২০১৮, ১:২৩ পূর্বাহ্ণ
bangla fonts
facebook twitter google plus rss
Natun Somoy logo

শৈলকুপায় অবৈধভাবে বালু ও মাটি উত্তোলনের হিড়িক


১৫ মে ২০১৮ মঙ্গলবার, ০৮:৫৮  পিএম

ঝিনাইদহ করেসপন্ডেন্ট

নতুনসময়.কম


শৈলকুপায় অবৈধভাবে বালু ও মাটি উত্তোলনের হিড়িক

ঝিনাইদহের শৈলকুপার কাতলাগাড়ী ঘাটের গড়াই নদীর বুক থেকে দীর্ঘদিন যাবৎ শতাধিক ট্রাক বালু উত্তোলন ও মাটি কাটা হচ্ছে। মাটি ও বালু শ্রমিকের পাশাপাশি সেখানে ৪ থেকে ৫ টি ভেকু ম্যাশিনের মাধ্যমেও নদীর বুক ও কিনারা খুড়া হচ্ছে। এতে করে ফসলি জমি ও বসতবাড়ী হুমকির মুখে পড়েছে। টানা বৃষ্টিতে ও নদীর পানি বাড়ার সাথে সাথে আশপাশ এলাকা নদী গর্ভে বিলিন হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

এছাড়া কাতলাগাড়ী এলাকা এখন ধুলি ধোঁয়া-শব্দ দূষনের অন্যতম বাজার। যানজটে নির্বিকার এলাকাবাসী, চরম ঝুকিতে রয়েছে শিশু হতে একাদশ শ্রেণী পর্যন্ত বিভিন্ন বয়সী প্রায় ৩ হাজার শিক্ষার্থী। বাজারের প্রধান সড়কে থাকা ঔষুধ, হোটেল, মুদিসহ বিভিন্ন খাদ্য জাতীয় দোকানীরা প্রভাবশালীদের দাপটে নির্বিকার ব্যবসা প্রতিষ্ঠান চালাচ্ছে। প্রতিদিন কাতলাগাড়ী বাজার অদূরে গড়াই নদীর অবৈধ বালি মহল ব্যবহার করে নাটা হাম্বার, মিনি ট্রাক, বড় ট্রাক মিলে প্রায় শতাধিক গাড়ী দিনভর বালি নিয়ে যায় দূর দূরান্তে। নদীতে ভেকু মেশিন লাগিয়ে দেদারছে গাড়ী ভর্তি বালি তুলে স্থানীয় ব্যবসায়ীরা ইটভাটা, রোড, ব্রীজ কালভার্টসহ পারিবারিক প্রয়োজনে ব্যবহার করছে।

সরেজমিন ঘুরে জানা যায়, কৃষ্ণনগর চর হইতে দীর্ঘদিন ধরেই অবৈধভাবে গড়াই নদী থেকে নিয়মিত বালি বিক্রি করে। ভোর অন্ধকার থেকে শুরু করে রাত গভীর পর্যন্তও ফিটনেস বিহীন ছোট বড় নানা প্রকার যানবাহনে ইটভাটাসহ এ বালি ও ফসলী জমির মাটি কেটে বিভিন্ন যায়গা বিক্রি করে থাকে। কাতলাগাড়ী বাজারের প্রধান সড়ক ঘেঁষে মৌবন মাধ্যমিক বিদ্যালয়, কাতলাগাড়ী নিম্নমাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়, কাতলাগাড়ী মাধ্যমিক বিদ্যালয়, কাতলাগাড়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, কাতলাগাড়ী নুরানী হাফেজিয়া মাদ্রাসা, গোয়ালবাড়িয়া প্রাথমিক বিদ্যালয় ও কাতলাগাড়ী ডিগ্রি কলেজ ছাড়াও রয়েছে বেশ কয়েকটি কিন্ডারগার্টেন ও ব্যক্তিগত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। এসব প্রতিষ্ঠানে সব মিলিয়ে ৩ সহস্রাধিক শিক্ষার্থী নিয়মিত লেখাপড়া করে। বাজার কেন্দ্রিক গড়ে উঠেছে উপজেলার বৃহৎ কাঠশিল্প কারখানা, দুটি বাজার, যার মধ্যে কাতলাগাড়ী নতুন বাজারেই রয়েছে কয়েক’শ ব্যবসায়ী এবং বাজার ঘেঁষেই রয়েছে তাঁতপল্লী এলাকা।

জনবহুল এ বাজারের পাউবোর প্রধান সেচখালে রয়েছে বহুপুরনো জরাজীর্ণ একটি ঝুকিপূর্ণ সেতু। রাতদিন ভারী যান চলাচলের জন্য যে কোন সময় ভেঙ্গে পড়তে পারে গুরুত্বপূর্ণ এ সেতুটি। জনগুরুত্বপূর্ণ কাতলাগাড়ীর দুটি বৃহৎ বাজারে শিক্ষক, শিক্ষার্থী, সাধারন মানুষের সমাগম লেগেই থাকে। এর মাঝেই চরম ঝুঁকি নিয়ে চলে বালি ব্যবসায়ীদের ফিটনেস বিহীন অদক্ষ ড্রাইভারদের বেপরোয় গাড়ী চলাচল। প্রতি বছর এসব বালি বোঝাই গাড়ীতে সড়ক দূর্ঘটনায় কেউ মারা যায়নি এমন রেকর্ড নেই। রাস্তায় যানজট লেগেই থাকে আর বিকট শব্দ, ধুলি ধোয়ার কমতি নেই কিছুতেই। হোটেল খাদ্যদ্রব্য বিক্রেতাদের সাথে প্রায়ই ড্রাইভার ও সাধারণ মানুষের বাকবিতন্ডা হয়। ব্যাংক, বীমা, স্কুল-কলেজের প্রধান এ সড়কের দুপাশ জুড়ে গড়ে ওঠা ব্যবসায়ীদের কষ্টের সীমা নেই। দূর্ভোগ চরমে ওঠে যখন একমুখি এ সরু রাস্তায় কোন বালি বোঝাই গাড়ী বিকল হয়ে পড়ে।

ছোট খাটো দূর্ঘটনা যেন এ রাস্তার নিয়মিত চিত্র। বালিমহল ব্যবহারকারীরা সরকারি দলের প্রভাবশালী হওয়ার কারনে স্থানীয় জনসাধারণ ভয়ে কিছু বলতে পারেনা। নদীর গতিপথ পরিবর্তন, ভূমিধ্বস, পরিবেশ বিপর্যয়ের পাশাপাশি গড়াই নদীর এ বালিমহল দখলকে কেন্দ্র করে দাঙ্গা-হাঙ্গামাও কম ঘটেনি। দিনশেষে হাজার হাজার টাকার বালি বিক্রির টাকা ভাগবাটোয়ারা নিয়েও রয়েছে নানা হামলা, মামলা সংঘর্ষের ঘটনা।

সচেতন এলাকাবাসীর দাবি সত্বর অবৈধ বালিমহল বন্ধ করে এলাকার পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় যথাযথ কর্তৃপক্ষ ভূমিকা রাখবে একই সাথে হাজার হাজার শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্য রক্ষাসহ বাজারের পরিবেশ দূষণ থেকে এলাকাবাসীর মুক্তি মিলবে। অনেকটা ভূমিদশ্যু কায়দায় আবাদী ফসলের জমি কেটে মাটি নিয়ে যাওয়া হয় বিভিন্ন ইটভাটায় কেউ বাধা দিলে তাকে রাতের অন্ধকারে গুনতে হয় মোটা অংকের চাঁদা, হয়রানি হতে হয় বিভিন্ন সময়ে।
চরে কর্মরত অপর এক শ্রমিক জানান, প্রতিটি বড় ট্রাক ৫শ টাকা, ট্রাক্টরচালিত ইঞ্জিন গাড়ী ৪শ টাকা, নাটা হাম্বার ৩৫০ টাকা ও অন্যান্য সকল পরিবহন ২২০ টাকা হারে নিয়মিত বালি বিক্রয় হয়। এ চরে নিয়মিত শতাধিক যানবাহন বালি পরিবহনের সাথে জড়িত রয়েছে। এছাড়া বালি মহলকে কেন্দ্র করে শৈলকুপা অংশের প্রশাসন মাসিক মাসোহারা ৮০ হাজার টাকা ও খোকসা প্রশাসন ১ লাখ ২০ হাজার টাকা নিয়ে থাকে।

কৃষ্ণনগর, বড়–রিয়া, কীর্ত্তিনগর এলাকার মানুষের সাথে কথা বলে জানা যায়, প্রতিবছর বালি ও মাটি কাটার ফলে গড়াই নদীর এপারে ভাঙ্গনের সৃষ্টি হয়। ঘরবাড়ি ভেঙ্গে নি:স্ব হয় মানুষ, নদীগর্ভে হারিয়ে যাচ্ছে তাদের ফসলী জমি।
বালি উত্তোলনকারী কৃষ্ণনগর গ্রামের আতিয়ার ও মাটি ব্যবসায়ী সিদ্দিক হোসেন জানান, গড়াই নদীর চরে জমির চারিদিক থেকে ভূমি খেকোরা মাটি কেটে নেওয়ায় প্রতিবছর আমাদের নিজ নিজ জমি নদীতে বিলিন হয়ে যায়। যেকারনে নিজেদের সংসার চালানোর তাগিদেই মাটির ব্যবসা করি। তাছাড়া গড়াই চরটি পার্শ্ববর্তি খোকসা থানাধীন, বালি উত্তোলনের সাথে ওপারের ব্যবসায়ীরা বেশী জড়িত।

খোকসা বেতবাড়িয়া ইউনিয়ন চেয়ারম্যান বাবুল আক্তার জানান, সীমানাটি খোকসার হলেও দৃশ্যমান নদীর ওপার অংশে হওয়ার কারনে চরের প্রায় সকল সুযোগ সুবিধাই ভোগদখল করেন শৈলকুপার সারুটিয়া ইউনিয়নের মানুষ। তিনি বলেন, এ চরকে ঘিরে অনেকবার খোকসা থেকে মোবাইল কোর্ট করা হলেও অবস্থানগত এবং নানা আইনী জটিলতার জন্য বালি খেকোদের হাত থেকে নদী ও পরিবেশ রক্ষা করা তার একার পক্ষে সম্ভব হয়না।
এবিষয়ে উপজেলা নিবার্হী কর্মকর্তা উসমান গনি বলেন, আমাদের অংশে কেউ গড়াই নদী থেকে বালি উত্তোলন করলে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। এছাড়া খোকসা উপজেলা প্রশাসনের সাথে কথা বলে যৌথ ব্যাবস্থা নেওয়া হবে।

নদী পাড়ের ফসলি জমি ও শত শত বসতবাড়ী নদী গর্ভে বিলিন হওয়ার আগেই অবৈধ বালু উত্তোলন ও মাটি কাটা বন্ধে এখনই প্রশাসনের কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিৎ বলে ভূক্তভোগীরা মনে করেন।

নতুনসময়.কম এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আপনার মন্তব্য লিখুন: