৪ কার্তিক ১৪২৪, শুক্রবার ২০ অক্টোবর ২০১৭, ৩:৫১ পূর্বাহ্ণ
bangla fonts
facebook twitter google plus rss
Natun Somoy logo

শেখ হাসিনা থেকে শিক্ষা নিতে পারেন সু চি


০৯ অক্টোবর ২০১৭ সোমবার, ০২:৪৪  এএম

বাহালুল মজনুন চুন্নু

নতুনসময়.কম


শেখ হাসিনা থেকে শিক্ষা নিতে পারেন সু চি

সংযুক্ত আরব আমিরাতের সর্ববহুল প্রচারিত দৈনিক খালিজ টাইমসের ব্লগে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে প্রাচ্যের নতুন তারকা হিসেবে অভিহিত করেছেন পত্রিকাটির মতামত সম্পাদক অ্যালন জ্যাকব। রোহিঙ্গা সংকটে শেখ হাসিনা যে মানবিকতা প্রদর্শন করেছেন তাতে মুগ্ধ হয়ে জ্যাকব তাঁকে ‘হিরো’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি লিখেছেন, মিয়ানমারের নেত্রী অং সান সু চি যখন কণ্ঠস্বর হারিয়েছেন এমন সময় শেখ হাসিনার সোচ্চার হয়ে ওঠা এক বিরাট স্বস্তি। সু চি ও শেখ হাসিনা তাঁদের নিজ নিজ দেশের মুক্তিসংগ্রামের মহানায়কের কন্যা। দুজনেই খুব কাছ থেকে ট্র্যাজেডি দেখেছেন। যদিও পার্থক্যটা বিশাল। মানবতা যখন বিপন্ন তখন একজন বেছে নিলেন শুধু দর্শকের ভূমিকা, আর অন্যজন প্রদর্শন করলেন অপরিসীম উদারতা। তিনি আরো লেখেন, জার্মান চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা মার্কেল যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশগুলো থেকে ১২ লাখ শরণার্থী গ্রহণের সাহস দেখিয়েছেন। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যতিক্রম, সম্পদ সীমিত। এটি বাংলাদেশ সরকারের কারণে সৃষ্ট কোনো জনস্রোত নয়, তথাপি শেখ হাসিনা তাঁর মানবিকতার জায়গা থেকে সরে যাননি। জ্যাকব তাঁর লেখায় শেখ হাসিনার প্রশংসা করে আশাবাদ ব্যক্ত করেন, বাংলাদেশি প্রধানমন্ত্রীর মতো নেতারা যখন কর্ণধার হন, তখন অভিবাসন সমস্যা নিয়ে হতাশায় নিমজ্জিত পৃথিবীতে জ্বলে উঠে আশার প্রদীপ।

এমন আশার প্রদীপ জ্বালিয়েই বাংলাদেশ ও বিশ্বে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা বইয়ে দিচ্ছেন শান্তি ও সমৃদ্ধির বাণী।

বঙ্গবন্ধুকন্যা জানেন এ দেশে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়াটা নানা কারণে বিপজ্জনক। তার পরও তিনি পাঁচ লক্ষাধিক রোহিঙ্গাকে নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থা করেছেন। শুধু তা-ই নয়, রোহিঙ্গাদের মনোবল দৃঢ় করতে, তাদের সান্ত্বনা-সহানুভূতি জানাতে ছুটে গিয়েছেন রোহিঙ্গা ক্যাম্পে। যেখানে চীন, ভারত, রাশিয়ার মতো বিশ্বশক্তি রোহিঙ্গাদের পক্ষে অবস্থান নেয়নি, সেখানে বঙ্গবন্ধুকন্যা দৃঢ়চেতা মনোভাবে রোহিঙ্গাদের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। তাদের আশ্রয়, খাওয়া, চিকিৎসার ব্যবস্থা কেবল গ্রহণই করেননি, তাদের নিজ দেশে মর্যাদার সঙ্গে পুনর্বাসিত করতে জাতিসংঘ ও বিভিন্ন দেশকে প্রতিনিয়ত চাপ দিয়ে যাচ্ছেন। তাঁর এই মানবিকতা, ঔদার্যতা দেখে বিশ্বের তাবৎ নেতৃত্বের চোখ খুলে গেছে। তাঁরাও এখন রোহিঙ্গাদের পক্ষে দাঁড়িয়ে মিয়ানমার সরকারকে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা এই সমস্যা সমাধানের জন্য চাপ দেওয়া শুরু করেছেন। যার ফলে আমরা দেখি রোহিঙ্গা নিধনের পক্ষে থাকা সু চির কণ্ঠে কিছুটা নরম সুর। তবে সেটা ছলও হতে পারে। শান্তিতে নোবেল পেলেও অং সান সু চির সরকার যেভাবে জাতিগত নির্মূল অভিযানে নেমেছে, যেভাবে হত্যা, লুটপাট, ধর্ষণ, অগ্নিকাণ্ডের মতো ঘটনার সূত্রপাত ঘটাচ্ছে, আর এসবের সমর্থনে তিনি যেভাবে কথা বলছেন, তাতে স্পষ্ট হয়ে যায় যে তিনি ক্ষমতায় টিকে থাকাকেই সর্বাধিক গুরুত্ব দিচ্ছেন এবং এর জন্য মানবিকতা শব্দটি থেকে সরে গেছেন যোজন যোজন দূরে। বঙ্গবন্ধুকন্যার মানবিকতার দৃষ্টান্ত তাঁর জন্য এ ক্ষেত্রে অনুকরণীয় ও শিক্ষণীয় হতে পারে। এ কথাই বিশ্বের খ্যাতিমান কলামিস্টরা তাঁদের লেখায় তুলে ধরেছেন। সু চিকে আহ্বান করছেন বঙ্গবন্ধুকন্যার পদাঙ্ক অনুসরণ করতে। এটি বাঙালি জাতির জন্য অনেক বড় পাওয়া এবং সেটা শান্তিতে নোবেল পাওয়া থেকেও অনেক বড় কিছু। একটা সময় পর্যন্ত কেবল বাঙালি জাতি বঙ্গবন্ধুকন্যার মাহাত্ম্য, উদারতা সম্পর্কে জানত, আজ সারা বিশ্বের মানুষ তাঁর মানবিকতা, ঔদার্যতা সম্পর্কে কেবল জ্ঞাতই নয়, প্রশংসায় পঞ্চমুখ, যা আমাদের জন্য অত্যন্ত গর্বের।

শেখ হাসিনা একজন দক্ষ দূরদর্শী বিচক্ষণ নেতা, অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপসহীন এক বলিষ্ঠ রাজনীতিবিদ ইত্যাদি নানা বিশেষণে তাঁকে বিশেষায়িত করা হয়। কিন্তু তাঁর যেই বিশেষ গুণটি তাঁকে অনন্য একজন রাজনীতিবিদে পরিণত করেছে সেটা হলো তাঁর মানবিকতা, মানুষের প্রতি অসীম মমত্ববোধ, মানুষের কল্যাণের তাড়না; যা তাঁকে সারা বিশ্বে এক অসাধারণ রাজনীতিবিদ ও প্রধানমন্ত্রী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। তাঁর ভেতরে হৃদয় দিয়ে হৃদয় অনুভব করার ক্ষমতা আছে, সহমর্মিতা আছে, ভালোবাসা আছে এবং আছে দারুণ মানবিক একটা বোধ, যা তাঁকে সর্বদা তাঁর জনগণের কল্যাণের দিকে ধাবিত করে। অসাধারণ মানবিক হৃদয়ের অধিকারী বঙ্গবন্ধুর কন্যা হিসেবে এই বোধ তিনি পেয়েছেন উত্তরাধিকার সূত্রে। জন্মের পর থেকেই শেখ হাসিনা টুঙ্গিপাড়ার বাইগার নদীর সৌন্দর্য, কাশবন, সবুজ বৃক্ষরাজির সৌন্দর্য যেমন দেখেছেন, তেমনি দেখেছেন দারিদ্র্যপীড়িত জনগোষ্ঠীর বিবর্ণ চেহারা। দেখেছেন পশ্চিম পাকিস্তানিদের অমানবিক শোষণের বিরুদ্ধে পিতার দীর্ঘ সংগ্রাম, আত্মত্যাগ। তাই তো তিনি দেশ ও মানুষকে ভালোবেসে শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠা, শৃঙ্খলমুক্তি, মানুষের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাসহ জনগণের জীবনমানের উন্নয়ন ঘটানোর জন্য নিরলস সংগ্রামে অবিচল পথ কেবল হেঁটেই চলেছেন না, তিনি মানবিকতা, ঔদার্যতা দিয়ে তাদের জীবনে বইয়ে দিচ্ছেন শান্তির সুবাতাস। ছকে আবদ্ধ নিয়মের বেড়াজালে বন্দি প্রধানমন্ত্রী তিনি নন। তিনি ব্যতিক্রম। প্রায়শই আমরা তাঁকে দেখি নিয়মের বেড়াজাল ভেঙে বেরিয়ে পড়তে। তিনি ভ্যানে ঘুরে বেড়ান। ভ্যান থামিয়ে স্থানীয় মানুষের সঙ্গে কথা বলে তাদের খোঁজখবর নেন। ছেলের জন্মদিনে নিজ হাতে রান্না করে খাওয়ান। কখনো বা দেখি সমুদ্রসৈকতে পা ভেজাতে, স্টেডিয়ামে টাইগারদের জয়ে হাততালি দিয়ে অকৃত্রিম প্রাণখোলা বিজয়ের হাসি হাসতে। এ দেশের যেকোনো সাফল্যে তাঁর মধ্যে যে উচ্ছ্বাস দেখা যায়, তা ছড়িয়ে পড়ে পুরো জাতির মাঝে, অনুপ্রাণিত করে আরো সাফল্যগাথা রচনার। সেই তাঁকেই আবার দেখা যায় হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে আহতদের করুণ অবস্থা দেখে অঝোরে কাঁদতে। কজনই পারে অন্যের দুঃখে এভাবে ব্যথিত হতে। তিনি পারেন। বঙ্গবন্ধুর কন্যা বলেই তিনি তা পারেন।

বঙ্গবন্ধুর মতো তাঁকেও অসহায় মানুষের দুঃখ-যন্ত্রণা ব্যথিত করে, প্রভাবিত করে। তাই তিনি তাদের পাশে দাঁড়িয়ে বাড়িয়ে দেন সহায়তার হাত। প্রায় সময়ই আমরা দেখি তিনি দেশের কবি, সাহিত্যিক, লেখক, শিক্ষক, অভিনেতা, সাংবাদিক, নারী-পুরুষ, শিশুসহ অসহায় ও সম্বলহীন মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে বেঁচে থাকার আশ্বাস দিতে, সহায়তা করতে। জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে থাকা অসহায় গুণীজনের শয্যা পাশে ছুটে যান, নেন চিকিৎসার দায়ভার। এমন দৃষ্টান্ত অসংখ্য। শুধু কি তাই? তিনি হয়ে উঠেন পিতা-মাতা হারাদের অভিভাবক। প্রায়ই তাঁকে দেখি অসহায় ও এতিম শিশুদের মায়ের মমতায় পরম স্নেহে বুকে টেনে নিতে, নিজের হাতে তাদের খাওয়াতে, যা শুধু বঙ্গবন্ধুর কন্যার পক্ষেই সম্ভব। নিমতলী ট্র্যাজেডির ঘটনায় তিন অসহায় মেয়েকে বুকে টেনে নিয়ে কন্যা স্বীকৃতি দিয়ে মায়ের মতো অদ্যাবধি যেভাবে তাদের প্রতি দায়িত্ব পালন করে চলছেন, তা তাঁর মহৎ হৃদয়ের অতি উজ্জ্বল নিদর্শন। নিরহংকার, সাদামাটা জীবনযাপন, মমতাময়ী মায়ের আদরতুল্য মাতৃস্নেহ তাঁকে কেবল বাঙালি নয়, বিশ্ববাসীর কাছে করে তুলেছে আদর্শ এক ব্যক্তিত্ব। বঙ্গবন্ধুকন্যার এই মানবিকতার গুণটি বেশ ভালোভাবে অনুধাবন করতে পেরেছিলেন দক্ষিণ আফ্রিকার অবিসংবাদিত নেতা নেলসন ম্যান্ডেলা। তাই তিনি শেখ হাসিনাকে উদ্দেশ করে বলেছিলেন, ‘তাঁর নেতৃত্বের অসাধারণ গুণ হলো নিপীড়িত, বঞ্চিত, দরিদ্র মানুষের পাশে দাঁড়ানো। শেখ হাসিনার মানুষের প্রতি ভালোবাসা আমাকে মুগ্ধ করেছে। ’ এ বিষয়ে নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন বলেছেন, ‘বিপুল জনপ্রিয় নেত্রী হলেও তিনি আসলে সুবিধাবঞ্চিত দরিদ্র্র মানুষের কণ্ঠস্বর। ’ নেলসন ম্যান্ডেলা কিংবা অমর্ত্য সেনের মতো মহান ব্যক্তিত্ব অনেক আগেই শেখ হাসিনার বিশাল হৃদয়ের পরিচয় পেয়েছিলেন। এখন সারা বিশ্ববাসী। তিনি অনুকরণীয়, অনুসরণীয়। তাঁর কাছ থেকে শিক্ষা গ্রহণ করতে পারেন অং সান সু চিসহ মানবতার বিপক্ষে অবস্থানকারী কিংবা মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত হতে দেখেও নিশ্চুপ থাকা বিভিন্ন দেশের নেতারা। তাহলে রোহিঙ্গা ইস্যুর সুষ্ঠু সমাধানই কেবল নয়, বিশ্বজুড়ে চলা সব হানাহানি, খুন-রাহাজানিসহ সব মানবতাবিরোধী অপরাধের প্রবণতা কমে যাবে আর বইবে শান্তির সুবাতাস।

লেখক : সিনেট ও সিন্ডিকেট সদস্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং সাবেক সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ

নতুনসময়.কম এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আপনার মন্তব্য লিখুন: