৮ কার্তিক ১৪২৪, সোমবার ২৩ অক্টোবর ২০১৭, ১২:০১ অপরাহ্ণ
bangla fonts
facebook twitter google plus rss
Natun Somoy logo

লড়াইটা মাঠে, অপ্রীতিকর প্রচারণায় নয়


১৫ জুন ২০১৭ বৃহস্পতিবার, ০৭:৫১  এএম

হাবীব ইমন

নতুনসময়.কম


লড়াইটা মাঠে, অপ্রীতিকর প্রচারণায় নয়
হাবীব ইমন

 

আইসিসি চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে সেমিফাইনালে ভারতের বিপক্ষে বাংলাদেশ খেলবে। পুরো ক্রিকেট বিশ্বেই এখন আলোচনা টেবিলে নানান কথা চলছে। বিশ্বকাপের পর বাংলাদেশের ক্রিকেটের ইতিহাসের সবচেয়ে এটি বড় ম্যাচ। ইতিমধ্যে বদলে যাওয়া বাংলাদেশকে নিয়ে কমেন্ট্রি বক্সে রমিজ রাজা, সঞ্জয় মাঞ্জেরকার, রবি শাস্ত্রী, সুনীল গাভাস্কার, সৌরভ গাঙ্গুলী তাদের মুগ্ধতার কথা জানিয়ে দিলেন।

কার্ডিফে নিউজিল্যান্ডকে যেভাবে হারিয়েছে বাংলাদেশ, শেষ চারের লড়াইয়ের আগে সেটি নিশ্চিত আত্মবিশ্বাসী করছে সাকিব-তামিম-মোসাদ্দেক-মাশরাফিদের। আরো এগিয়ে যাবে বাংলাদেশ। সেমিফাইনালের এ খেলা হওয়া উচিত, স্মরণকালে বড় বিপর্যয়-পার্বত্যাঞ্চলে পাহাড়ধসে নিহতদের প্রতি উৎসর্গ করে। খেলোয়াড়রা তাদের মানবিকবোধে কালো ব্যাজ পরে মাঠে নামবেন। মাথা ঠাণ্ডা রেখে সমন্বিত প্রচেষ্টায় ব্যাটিং, বোলিং, ফিল্ডিং ঠিকমতো খেললে ভারত কুপোকাত হবে, আমরা ফাইনালের দিকে এগিয়ে যাবো বলে আমি বিশ্বাস করি।

আমরা নিশ্চয় সবাই বাংলাদেশের পক্ষে থাকবো। খেলার মাঠে কিংবা টেলিভিশনের পর্দার সামনে সমর্থন দেবো। পাগলহারা হবো। এখানে ভারত বিরোধীতা কিংবা পাকিস্তান ভাবধারা-দুইটি শিবিরে বিভাজিত অতি আক্রমণাত্মক মনোভাব কেউ দেখাবে না, এই প্রত্যাশা আমাদের সকলের। থাকবো, দেবো, হবো-এসব শব্দের মধ্যে জোর রাখতে চাইলেও রাখতে পারছি না। কেননা, আমাদের মধ্যে এই জোরটা কম। কেনো কম তা একটু পরে আলোচনার ভেতরে পাবেন।

সেমিফাইনালে বাংলাদেশ নিশ্চিত হওয়ার পর একজন ফেসবুকে একটা স্ট্যাটাস দিয়েছে, ভারতকে বাংলাদেশ হারাতে পারলে গরু জবাই করবেন। এধরনের বক্তব্যে ভারত বিদ্বেষ প্রমাণ করে না শুধু, এটি একধরনের সাম্প্রদায়িকতার মানসিকতাও। ভারত বিরোধীতার মধ্যে সবকিছুর মধ্যে একধরনের ঘৃণার চাষ করি, সাম্প্রদায়িকতার ছুরি ঘোরাতে শুরু করি। পাকিস্তানি ভাবধারা যারা, তারা পোষণ করেন, তাদের পক্ষে একমাত্র এ ধরনের মন্তব্য করা যায়। আমরা জানি, ভারতের অধিকাংশ মানুষ গরুকে পূজা করে, বাংলাদেশে কোনো কোনো সম্প্রদায়ও। আমি এও দেখেছি, ঢাকায় কোথাও কোথাও এখন আছে, বিশেষ করে ইস্কাটনে কোনো কোনো গলি, বাংলাদেশের বিপক্ষে পাকিস্তান জয়লাভ করার পর এলাকায় এলাকায় বাদ্য-যন্ত্র নিয়ে আনন্দ-উল্লাস করে।

আমাদের বাংলাদেশ। সতের কোটি বাঙালির বাংলাদেশ। মুক্তিযুদ্ধে লড়াই করা বাংলাদেশ। এটাই বড় কথা। ধর্ম-বর্ণ সেখানে কোনো বিষয় নেই। মনে রাখতে হবে, বাংলাদেশ কারো দানে পাওয়া নয়। কারো কাছ থেকে ভিক্ষে নিয়ে অর্জিত হয়নি। মরণপন যুদ্ধ করে আমরা স্বাধীন হয়েছি। একসময় আমার পাড়ায় দেখতাম, ভারতের সাথে বাংলাদেশের খেলা হচ্ছে, কিছু মানুষ ভারতকে খুব উৎসাহের সাথে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে। হৈ হৈ করে যাচ্ছে। বাংলাদেশকে তার দেশ মনে হতো না। মনে হতো বাংলাদেশ একটি ভিন্ন কোনো দেশ। কেন এমন মনে হবে! দ্বিজাতি-দ্বিধর্ম বিশিষ্ট চিন্তার মানুষ যারা, তাদের পক্ষেই এসব সম্ভব। ছোট দেশ বলে আমরা আমাদের সার্বভৌমত্ব হারাবো তা হতে পারে না।

হলফ করে বলুন তো, বাংলাদেশের বিপক্ষে যখন অন্য একটি দলের খেলা হয়, তখন কি পাকিস্তান বাংলাদেশকে ইসলাম ধর্মাবলম্বী দেশ মনে করে সমর্থন করে? নাকি এই ধরনের বক্তব্যও আসে ইমরান খানের মুখ থেকে, বাংলাদেশ চ্যাম্পিয়নস ট্রফির সৌন্দর্য নষ্ট করেছে। আবার দেখি আমাদের দেশেরই কেউ কেউ তার পক্ষে সাফাই গাচ্ছে। ইমরান খানের মত একই রকম না হলেও, কথার মারপ্যাঁচ আলাদা নয়, ভারতের কোনো কোনো উগ্রবাদী ক্রিকেটার বাংলাদেশ নিয়ে বিরূপ মন্তব্য করেছে। করেছে তো! গত ক্রিকেট বিশ্বকাপে দেখেছি, ভারতের কিছু মানুষ, নেতৃস্থানীয় তারা, মানসিকভাবে আঘাত করার চেষ্টা করেছে। বিজ্ঞাপন বানানো হয়েছে। নানান মন্তব্য ছুঁড়েছে। অধিকাংশই মন্তব্য সূচক।

আমি বলবো না শুধু ভারত থেকে এসব এসেছে, বাংলাদেশের কিছু মানুষও লিপ্ত ছিল তাতে। পাকিস্তানের সাথে উত্তরাথিকারসূত্রে আমাদের সম্পর্ক বিদ্বেষের। কিন্তু ভারতের সাথে নয়। ওদের সাথে আমাদের সম্পর্ক ঐতিহাসিক ও বন্ধুত্বপূর্ণ। কেউ মানুক আর নাই মানুক, এটাই সত্য।

আমার একটি কথা, ভারত বিদ্বেষ দেখাতে গিয়ে মওকা কিংবা অন্যকোনো ধরনের অপ্রীতিকর-অসৌজন্যমূলক নিপীড়নটাইপ প্রচারণা চালাবেন না। এই ধরনের প্রচারণা বাঙালি কিংবা বাংলাদেশিদের চরিত্র নয়। যারা জানেন না, তারা জেনে রাখুন, ইতিহাসে পাঠ নিন। ইতিহাস পাঠ দিতে এ লেখা নয়। শুধু বলবো, বাংলাদেশের রাজনীতি-সামজিকতায় সুদীর্ঘ চমৎকার মেলবন্ধনের ঐতিহ্য আছে, এ ঐতিহ্যের ভেতর পরমত সহিষ্ণুতা, সমস্ত কিছু দিয়ে লড়াই করার বাসনা রয়েছে। এ ঐতিহ্যকে রক্ষা করার দায়িত্ব আমাদের। লড়াইয়ের মাঠে শুধু একাদশ খেলোয়াড় নয়, সাথে থাকুন বাংলাদেশের ষোল কোটি মানুষ, একাট্টা হয়ে নেমে পড়–ন। আশাকরি এ ঐতিহ্য বজায় রাখবেন সবাই। প্রতিপক্ষকে সম্মান দেখানোটা হচ্ছে ভদ্রতা। এটা একটি দেশের সংস্কৃতিমুখি সভ্যতা।

আমাদের দেশের মানুষের দেশপ্রেমের কোনো তুলনা নেই। দেশের প্রশ্নে আবেগাক্রান্ত হন না, এইদেশে এইরকম মানুষ খুব কম আছে। এই যে ক্রিকেট ক্রিকেট বলে আমরা পাগলহারা, সেটাতো দেশকে ভালোবাসি বলেই, আমরা যাদেরকে বলি নিম্নস্তরের মানুষ ভাবি, তরাও কেমন লাল-সবুজ পতাকা নিয়ে বাংলাদেশ বাংলাদেশ বলে রাস্তায় বেরিয়ে পড়ছে। কী ভীষণ দেশপ্রেম! দেশপ্রেম জারি রাখুন। আমাদের তারুণ্যের অজেয় সম্ভাবনা, অমিত তেজ গর্জে উঠবে সবসময়।

লেখক: কবি, প্রাবন্ধিক ও রাজনীতিক

নতুনসময়.কম এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আপনার মন্তব্য লিখুন: