২ পৌষ ১৪২৪, রবিবার ১৭ ডিসেম্বর ২০১৭, ৮:১৭ পূর্বাহ্ণ
bangla fonts
facebook twitter google plus rss
Natun Somoy logo

মানবতার পুরস্কার এবং পুরস্কারের মানবতা!


০৫ ডিসেম্বর ২০১৭ মঙ্গলবার, ০৩:৪৭  পিএম

রায়হান উল্লাহ

নতুনসময়.কম


মানবতার পুরস্কার এবং পুরস্কারের মানবতা!

পুরস্কার কাজে অনুপ্রেরণা দেয়। ব্যক্তিটিকে নতুন করে ভাবতে শেখায়-কোনোকিছুই বৃথা যায় না! প্রকৃতই কোনো কাজই বৃথা যায় না। এ কথাটি যারা কাজের তারা জানেন!

বিজ্ঞানের ভাষায়, কাজের একটি ফলাফল থাকা চাই। ফলাফলহীন কাজ কাজ নয়। পুরস্কারকে কি কাজের একটি ফলাফল বলা যায় না? বলা যায়, তবে সর্বাগ্রে না!

কাজ হয়েছে বলে একটি কথা আছে। এর মানে এই বুঝায়-ফলাফল এসেছে। পুরস্কার কাজের একটি ফলাফল, পুরোপুরি না। আবার পুরস্কারওতো একটি অদৃশ্য বিষয়। দৃশ্যমান পুরস্কার আছে, আবার অদৃশ্যও আছে। পৃথিবীতে লাখ লাখ বছর পর যা কিছু আবিষ্কৃত হয়, তা পূর্বে অদৃশ্য ফলাফলে ভাসে, আবিষ্কার হওয়ার পর দৃশ্যমান হয়।

দৃশ্যমান পৃথিবীর ব্যক্তি-সংস্থা যা কিছু শিল্পের তরে বিলি করে তা পুরস্কারের একটি ধরন। আরও কিছু থাকে। মানুষের ভালোবাসা অদৃশ্য অংশে বিশাল জায়গাজুড়ে আছে!

দৃশ্যমান সময় যা কিছু করে তা পুরোপুরি ঠিক হয় না। এর মানে দৃশ্যমান পৃথিবী ভুল করে তিরস্কারের স্থলে পুরস্কার দিয়ে দেয়। এটা সহজাত এবং একটি সরল ভুল!

পুরস্কার, কাজ ও দৃশ্য-অদৃশ্য পৃথিবী নিয়ে এত কথা সাম্প্রতিক-আধুনিক বিশ্বের অস্থিরতার ফসল। আমরা দেখি সারা বিশ্ব সময়ে সময়ে মানবতার গান বেঁচে আসারাই শাসন করেন, শাসন করার সুযোগ পান। তারাই পারমানবিক বোমায় একটি নগরের মৃত্যু ঘটিয়ে দেন। হুমকি দেন দেশের মৃত্যু ঘটানোর, আরও এগিয়ে পুরো বিশ্বের! এর একমাত্র কারণ মানবতার গানের জলসা শেষে ব্যক্তিক পুঁজি সংগ্রহের সময়ে বাধা মানতে পারেন না তারা। তখনই শুরু হয় থ্রেট। তখনই সবার আগে আক্রান্ত হয় মানবতা! এসব অবশ্য তাদের দেখলে হয় না, ঠিক তারা দেখতেও চান না!

দৃশ্যমান পুরস্কারের সামগ্রিক শাখায় নোবেল একটি বড় অংশজুড়ে রয়েছে। এটি পেতে উদগ্রিব থাকেন অনেক বিশ্ব রথী-মহারথী। আবার অনেক প্রকৃত রথী-মহারথী এটির চৌদ্ধগুষ্ঠি উদ্ধার করে ছাড়েন। নোবেলতো দৈবিকতার বাইরে না। তাই এটিতে ছলাকলা হবেই। এটাই মানতে নারাজ এবং তাই পুরস্কারটিও বগলদাবা করতে নারাজ শেষের অংশটি। আর প্রথম অংশে চলে যুদ্ধ। এর অংশ হতে হয় নোবেল কমিটিকেও।

ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইলের বাংলা ভূমিতে অবস্থান করে বৈশ্বিক চোখ ঘুরেফিরে আশেপাশেই ফিরে আসে। তখন দেখা যায় পুরস্কারজয়ীদের আস্ফালন।

সাম্প্রতিক আস্ফালন দেখাচ্ছেন মিয়ানমারের গণতন্ত্র পুনরোদ্ধারকারী শান্তিতে নোবেল বিজয়ী অং সান সু চি। তিনি একটি সময় যে ধৈর্য ও মেধার পরিচয় দিয়েছেন, তারই দৃশ্যমান বৈশ্বিক ফলাফল নোবেল বিজয়। কিন্তু ক্ষমতার আঁচ সবাই সহ্য করতে পারেন না; ক্ষমতার আধারও সবাই হয়ে উঠতে পারেন না। এরই প্রকৃষ্ট উদাহরণ অং সান সু চি। তিনি ক্ষমতার ভারে বদলে যান বা তার আসল রূপ দেখাতে শুরু করেন। এরই দৃশ্যমান ফলাফল তার দেশের রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের ওপর সহিংসতা-বর্বরতা। প্রকৃত তার দেশেরই নাগরিক তারা। ধর্ম, বণ, ভাষা ও আরও অনেক ব্যবধানে তারা একটি ধর্মধারী। এরই প্রেক্ষিতে তারা দেশ খোঁজে পায় না। বৈশ্বিক নাগরিক হয়েও শরনার্থী তারা। দেখে জীবনের আজব সময়!

এমনই সময় কথা আসে-অং সান সু চি শান্তির নোবেল জয়ী। এটা কীভাবে হজম করবে রোহিঙ্গারা। কীভাবে মেনে নিবে সারা বিশ্বের আপামর মানুষ। যারা কেটি কোটি নোবেল বিশ্বের প্রান্তরে ছড়িয়ে আসে। হাঁতুড়ি-শাবল-কাস্তে-লাঙ্গলে বুঁনে আসে অসংখ্য নোবেলের বীজ!

প্রহসন তারাই সবার থেকে বেশি শৃঙ্খলিত, নিষ্পেসিত এবং শ্রেণি বিভাজনের শিকার। না হয় ঠুনকো ভাগাভাগি কেন?

অং সান সু চির শান্তির শাখায় বাংলাদেশের একজন নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস। তিনি অর্থনীতির শিক্ষক। তিনি ১২ সেপ্টেম্বর ২০১৭ তারিখে সু চিকে এই সময়ে মিয়ানমারের রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান করতে বললেন। বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের দেখে যেতে বললেন। বললেন, তিনি (সু চি) বাংলাদেশে এসে শরণার্থীদের এই বলে আশ্বস্ত করতে পারেন যে, মিয়ানমার যেমন তার দেশ, এটা শরণার্থীদেরও দেশ; তিনি তাদের ফিরিয়ে নিতে এসেছেন। অং সান সু চির এ ধরনের একটি সফর ও বক্তব্য পুরো পরিস্থিতিই শান্ত করে দিতে পারে বলে মনে করেন ইউনূস।

দশকের পর দশক নির্যাতন সহ্য করে মিয়ানমারে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে অবিচল থাকা সু চির প্রতি প্রত্যাশা জানিয়ে মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, তিনি নিশ্চয়ই এমন একটি নতুন মিয়ানমার গড়ে তুলতে চান, যেখানে কোনো ধরনের বৈষম্য থাকবে না-জাতিগত, ধর্মীয়, ভাষাগত বা সাংস্কৃতিক। একে গড়ে উঠতে হবে মানুষের অধিকার ও আইনের শাসনের উপর ভিত্তি করে। তার জীবনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময়টা এখন তার সামনে। তিনি কোন পথে যাবেন-শান্তি ও বন্ধুত্বের নাকি ঘৃণা ও সংঘর্ষের, তা বেছে নেবার ঐতিহাসিক মুহূর্ত এটাই।

রাখাইন সংকট সমাধানে জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব কফি আনানের নেতৃত্বাধীন কমিশনের সুপারিশগুলো বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্ব দেন ইউনূস। আনান কমিশনের সুপারিশগুলোর পূর্ণ ও তাৎক্ষণিক বাস্তবায়ন রোহিঙ্গা সংকটের অবসান ঘটাতে সক্ষম বলে মনে করেন তিনি।

মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, আমরা নতুন বিতর্কে না গিয়ে সরাসরি এখান থেকেই শুরু করতে পারি।

ইউনূস বলেন, আমরা এখনই ব্যবস্থা না নিলে র্যা ডিকালাইজেশনের যে আশঙ্কার কথা আনান কমিশন মিয়ানমার কর্তৃপক্ষকে মনে করিয়ে দিয়েছে তা বাস্তবে নিশ্চিতভাবে জটিলতর হতে থাকবে। ত্বরিত ব্যবস্থা নিতে সময়ক্ষেপণ এবং মিয়ানমার সরকারের নীরবতা ও নিষ্ক্রিয়তা শান্তি স্থাপন প্রক্রিয়াকে বিলম্বিত ও কঠিন করে তুলবে।

মুহাম্মদ ইউনূস প্রস্তাব করেন, আনান কমিশনের সদস্যদের নিয়ে অবিলম্বে একটি ‘বাস্তবায়ন কমিটি’ গঠনের, যাদের কাজ হবে কমিশনের সুপারিশগুলোর যথাযথ বাস্তবায়ন তত্ত্বাবধান করা।

তার অন্যান্য সুপারিশের মধ্যে রয়েছে, দেশটি থেকে শরণার্থীর প্রবাহ বন্ধ করতে অবিলম্বে পদক্ষেপ গ্রহণ, আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের নিয়মিতভাবে পীড়িত এলাকাগুলো পরিদর্শন করতে আমন্ত্রণ জানানো, যেসব শরণার্থী ইতোমধ্যে দেশত্যাগ করেছে তাদের ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করা, ফিরে যাওয়া শরণার্থীদের পুনর্বাসনের জন্য জাতিসংঘের অর্থায়ন ও তত্ত্বাবধানে মিয়ানমারে ট্রানজিট ক্যাম্প স্থাপন, বাস্তবায়ন কমিটির কর্তৃত্বে আনান কমিশনের প্রতিবেদনের সুপারিশ মোতাবেক রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব প্রদান এবং রোহিঙ্গাদের রাজনৈতিক স্বাধীনতা ও অবাধে চলাফেরার স্বাধীনতা নিশ্চিত করা।

রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে মুহাম্মদ ইউনূস কথা বলছেন না বলে সরকারের এক মন্ত্রীর বক্তব্যের কয়েক ঘণ্টা পর মুহাম্মদ ইউনূসের পক্ষে ইউনূস সেন্টারের এই বিবৃতি এল।

এখন কী বলা যায়? কেউই ব্যক্তিস্বার্থ বাদ দিয়ে পৃথিবীর মঙ্গল চান না। এতটা মহান তারা নন। আর এর জন্যই এত বিতর্ক-হানাহানি।

তারা সবকিছু অর্থনীতির সংজ্ঞায়নে দেখেন। মানবতা অর্থনীতির মধ্যে খাপে-খাপে; খাপ খায় না! একজন প্রিয় কলামনিস্ট লিখেছিলেন, নোবেল বিজয়ীর সমালোচনা করতে গেলে নোবেল বিজয়ী লাগবে। অবশ্য অঘোষিত বৈশ্বিক সংবিধান বলে সাধারণ মানুষ সবার সমালোচনা করতে পারে। না হয় অং সান সু চি ও ড. মুহাম্মদ ইউনূসের ভুলগুলো ধরা পড়ত না!

দায়শোধ : ড. মোহাম্মদ ইউনূস যতটুকু সম্ভব বা দেয়ার কথা বাংলাদেশ ও বিশ্বকে ততটুকু দেননি বা দিতে পারেননি। এর দায় তার এবং আমাদের।

পুন দায়বোধ : এই সময়ে বড় বেশি একজন নজরুলের প্রয়োজন। একজন দুখু মিয়াই চায়।

পুন পুন দায়বোধ : আসানসোলের রুটি বিক্রেতা, লেটো গানের দলে জীবনের জ্ঞান খুঁজে নেয়া বিদ্রোহী কবি এবং বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম কিন্তু পুরস্কারের সঙ্গেও বিদ্রোহ করেছেন!

লেখক : কবি ও সাংবাদিক

নতুনসময়.কম এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আপনার মন্তব্য লিখুন: