১৪ আষাঢ় ১৪২৪, বুধবার ২৮ জুন ২০১৭, ১১:২২ অপরাহ্ণ
bangla fonts
facebook twitter google plus rss
Natun Somoy logo

মনে হয় বাবা যেন বলছে আমায়…


১৮ জুন ২০১৭ রবিবার, ০৬:৩৫  এএম

রীতা রায় মিঠু

নতুনসময়.কম


মনে হয় বাবা যেন বলছে আমায়…

কয়েক বছর আগে চ্যানেল আই ক্ষুদে গানরাজ সঙ্গীত প্রতিযোগীতা অনুষ্ঠানে ছোট্ট মেয়ে তুবা গেয়েছিল, ‘চোখ মুছে মুখ তোল, স্নেহের বাঁধন খোল, এবার তোমায় দিতে যে হয় যাবার অনুমতি…আমি যাচ্ছি বাবা`। গানটি অনুষ্ঠানে আগত অনেককে কাঁদিয়েছিল, আমাকে এখনও কাঁদায়। তিন মিনিটের গানটিতে গীতিকার ও সুরকার বাবা আর মেয়ের পারস্পরিক সম্পর্ক এমনভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন যে না কেঁদে উপায় নেই। তাই আমিও কাঁদি। কান্নার ভেতর দিয়ে বাবাকে অনুভব করি। অনুভব করি জীবনে বাবার অস্তিত্বকে, অনুভব করি জীবনের স্বপ্ন সিঁড়ি তৈরীর কারিগরটিকে।

আজ বিশ্ব বাবা দিবস। বিশ্বের প্রায় প্রতিটি দেশে ফাদার’স ডে উদযাপিত হয় মহা আড়ম্বরের সাথে। যদিও আমরা বিশ্বাস করি যে বাবা বা মায়ের জন্য আলাদা কোনো দিন থাকা উচিত নয়, কারণ আমাদের জীবনের প্রতিটি দিনের সাথে বাবা-মা জড়িয়ে আছে, তারপরেও বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে অনেকটাই মাদার’স ডের পরিপূরক হিসেবে ফাদার’স ডে পালন করা শুরু হয়েছে। মা দিবসে মায়ের জন্য যতটা আবেগ, অনুভূতি, দরদ প্রকাশ করে নানা রকম আনন্দ উৎসবের আয়োজন করা হয়ে থাকে, বাবা দিবসে ঠিক ততটা না হলেও উৎসব আয়োজনে তেমন একটা কমতিও থাকে না। বাবা দিবস আয়োজনের মধ্যে দিয়েই বাবার প্রতি সম্মান, ভালোবাসা, শ্রদ্ধা প্রকাশ করা হয়ে থাকে।

অধিকাংশ দেশে জুন মাসের তৃতীয় রোববার ‘ফাদার’স ডে’পালিত হয়ে থাকে।

আমাদের এই উপ মহাদেশে বাবা দিবস অথবা মা দিবস নামে আলাদা কিছু ছিল না। আমরা মনে প্রাণে বিশ্বাস করি, বছরের প্রতিটি দিনই বাবা এবং মা’কে ঘিরে আমাদের সুখ-দুঃখ, স্বপ্ন-কল্পনা, ভালো-মন্দ, হাসি-কান্না জড়িয়ে আছে। আলাদা করে বছরের নির্দিষ্ট একটি দিনে বাবা বা মা’কে নিয়ে সমস্ত কর্মকাণ্ড, হাসি উল্লাসের কথা আমাদের ভাবনাতে ছিলনা। মা দিবস বা বাবা দিবস উৎসবের শুরুটা হয়েছে পাশ্চাত্যের দেশগুলো থেকে। সূত্রমতে ১৯১০ সালে অফিসিয়ালি ফাদার’স ডে পালিত হয় আমেরিকার ওয়াশিংটন রাজ্যের স্পোকেন শহরের ছোট্ট এক বাড়িতে।

সোনোরা স্মার্ট ডড নামের এক তরুণী সর্বপ্রথম ফাদার’স ডে সেলিব্রেট করে ১৯১০ সালের ১৯ জুন। সোনোরার বিপত্নীক পিতা উইলিয়াম জ্যাকসন স্মার্ট তার ছয় সন্তানকে পরম মমতায় বড় করেছিলেন। মাতৃহীন সংসারে ‘সিভিল ওয়ার ভেটেরান’পিতা উইলিয়াম স্মার্ট একাধারে বাবা ও মায়ের ভূমিকা পালন করেছিলেন। সোনোরা তাদের জীবনে বাবার ভূমিকাকে গৌরবান্বিত করার লক্ষ্যেই ‘ফাদার’স ডে’ সেলিব্রেট করার পরিকল্পনা করেন। এই পরিকল্পনা সকলের মাঝে প্রচারের জন্য সোনোরা প্রতিটি চার্চ, বিপণন কেন্দ্র, ওয়াই এমসিএ, অফিস-কাচারীসহ সম্ভাব্য সকল জায়গায় যোগাযোগ করতে থাকেন। এভাবেই এক সময় তার এই প্রচেষ্টা সাফল্যের মুখ দেখে। রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে ১৯১০ সালে প্রথমবারের মত ‘ফাদার’স ডে’উদযাপিত হয়।

১৯১৩ সালে আমেরিকান কংগ্রেসে জুনের তৃতীয় রোববারকে ফাদার’স ডে হিসেবে ঘোষণা করার জন্য বিল উত্থাপণ করা হয়। পরবর্তীতে ১৯১৬ সালে প্রেসিডেন্ট উড্রো উইলসন এবং ১৯২৪ সালে তৎকালীণ প্রেসিডেন্ট ক্যালভিন কুলী ‘ফাদার’স ডে’ বিলটি সমর্থন করেন। কিন্তু দুইবারই কংগ্রেস কর্তৃক প্রস্তাবটি প্রত্যাখ্যাত হয়। তারপরেও পরবর্তী আরো অনেক বছর ফাদার’স ডে বিলটি নিয়ে অনেক দেনদরবার চলে। ১৯৬৬ সালে প্রেসিডেন্ট লিনডন জনসন ফাদার’স ডে বিলটি আমলে নেন এবং কংগ্রেসে আলোচনার ঘোষণা দেন। ছয় বছর পরে ১৯৭২ সালে প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন বিলটি সাইন করেন এবং এরপর থেকে ফাদার’স ডে জাতীয়ভাবে উদযাপন করা হয়।

ফাদার’স ডে উপলক্ষ্যে পশ্চিমা দেশগুলোতে একমাস আগে থাকতেই সাজ সাজ রব উঠে। বাবাকে উপলক্ষ্য করে কত রকমের উপহার সামগ্রী দিয়ে বিপণী বিতানগুলো সাজানো থাকে। টি শার্টের গায়ে ‘লাভ ইউ ড্যাড’, ‘মাই ড্যাড ইজ মাই হিরো’ জাতীয় কতরকম আবেগী কথামালা লেখা থাকে। আমাদের দেশেও বাবা দিবসে নিশ্চয়ই নানা রকম উপহার সামগ্রীতে বিপণী বিতানগুলো ভরে উঠে। লাখ লাখ টাকার পণ্যসামগ্রী ক্রয় বিক্রয় হয়। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, আমেরিকাতে `ফাদার`স ডে উপলক্ষ্যে বিলিয়ন ডলারের উপহার বিক্রী হয়ে থাকে প্রতি বছর।

উপহার দেয়া ছাড়াও এই দিনটিতে `বাবা`কে নিয়ে বেড়াতে যাওয়া, মুভী দেখা, ফিশিং করতে যাওয়া, রেস্টুরেন্টে নিয়ে যাওয়াসহ আরো কত কিছুর আয়োজন থাকে। পাশ্চাত্যের দেশগুলোতে নিজ বাবা ছাড়াও স্টেপ ড্যাড, ফস্টার ড্যাড, গডফাদার জাতীয় বাবা সম্পর্কিত সকলকেই সম্মান জানানো হয়। মাদার`স ডে বা ফাদার`স ডে উপলক্ষ্যে আমেরিকানদের উচ্ছাস, আনন্দ, আবেগের মধ্যে কোনো অভিনয় থাকে না। ওদের উৎসব আয়োজনে থাকে আন্তরিকতার ছোঁয়া। দেখে মন ভরে যায়।

প্রবাসীদের মনকেও তা ছুঁইয়ে যায়। আমরা যারা প্রবাসে থাকি, তারা আবেগাক্রান্ত হই, ঘড়ির কাঁটা মিলিয়ে দেশে ফোন করি, পরম মমতাভরা কণ্ঠে বাবাকে বলি, ‘হ্যাপী ফাদার`স ডে বাবা`। ফোনের অপরপ্রান্তে `ফাদার`স ডে কালচারে অনভ্যস্ত বাবাটিও আহ্লাদে গদগদ হয়ে উঠেন। কোনো উপহারের প্রয়োজন পড়ে না, সন্তানের গলার আওয়াজটি পেয়েই বাবা খুশী হয়ে উঠেন, চাপা গর্বে পাড়ার দোকানে হঠাৎ দেখা প্রতিবেশীকে ডেকে হয়ত বলেন, ‘আজকে মেয়ে ফোন করেছিল, ফাদার`স ডে জানালো।’ এইই হচ্ছে বাবা। বাবা তো এমনই হয়!

বাবা শব্দটিতে কত মাধুর্য্য, কত নির্ভরতা। পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি মেয়ে `মা` হতে পারে। কিন্তু প্রায় প্রতিটি পুরুষ `বাবা` হতে পারে না। সন্তান জন্ম দিলেই একটি মেয়ে `মা` হয়ে উঠে, কারণ প্রকৃতিই তা নির্ধারণ করে দেয়। মায়ের নাড়ীর সাথে সন্তানের যোগ থাকে বলেই `মা-সন্তানের` সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য, অটুট। বাবার ক্ষেত্রে তা হয় না। সকল জন্মদাতাই পিতা বা বাবা হতে পারে না। আর তাই পৃথিবীতে হতভাগ্য কোটি কোটি শিশু মায়ের নাম জানলেও তার `বাবা`র পরিচয় জানে না। কারণ হতভাগ্য কোটি শিশুর জন্মদাতা বীরপুরুষেরা মনের আনন্দে অথবা খেলাচ্ছলে্‌ কখনোবা বিকৃত উল্লাসে নির্দ্বিধায় শিশুগুলোকে পৃথিবীতে নিয়ে আসে, কিন্তু তারা কেউ `বাবা` হতে চায় না।

তারা আনন্দ-ফূর্তি করতে রাজি আছে, যে কোনো সময় অসহায় নারীকে বলাৎকার করতে প্রস্তুত থাকে, কিন্তু ক্ষণিক আনন্দের ফসলটিকে ঘরে তুলতে চায় না, অনেক ক্ষেত্রেই তারা জানতেও পারে না তাদের ক্ষণিক আনন্দের প্রাপ্তিটুকু নিয়ে অসহায় এক নারী কি বিড়ম্বনার মধ্যে পড়ে! রাজায় রাজায় যুদ্ধ হয়, দেশে দেশে যুদ্ধ হয়, আর প্রতিটি ক্ষেত্রেই অবধারিতভাবে কিছু মানব সন্তানের জন্ম হয়, যাদেরকে বলা হয় `যুদ্ধশিশু`। সেই সমস্ত শিশুর `বীরাঙ্গনা মা` থাকে, `বাবা` থাকে না। `পতিতালয়` নামক সমাজের আরেকটি অংশে প্রতিদিনই শিশুর জন্ম হচ্ছে, যাদের শুধু মা থাকে, বাবা থাকে না। পশ্চিমা দেশগুলোতে মা ও শিশু থাকে, `বাবা` থাকে না।

জন্ম দিলেই বাবা হওয়া যায় না, `বাবা` হতে হয়। অনেক ত্যাগ তিতীক্ষা, অনেক পরিশ্রম, অনেক দায়িত্ববোধ, বিশাল হৃদয়, অকৃত্রিম ভালোবাসা, অশেষ স্নেহ জড়ানো থাকে `বাবা` হয়ে উঠার পেছনে। এমন কঠিন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যে মানুষটি সংসারে আবির্ভূত হয়ে থাকেন, সংসারে প্রতিষ্ঠিত হয়ে থাকেন, `সংসার নৌকা`র হালটি ধরে রাখেন, যেই মানুষটি স্বপ্ন দেখেন ও স্বপ্ন দেখান, সেই মানুষটিই আমাদের `বাবা`। সেই বাবাটিকে বছরের প্রতিটি দিনই আমাদের জীবনে প্রয়োজন, আর আমাদের প্রয়োজন একটিমাত্র দিন, যেদিনটিতে আমরা `বাবা`দের `বাবাত্ব`কে সম্মান করতে পারি, বাবাত্বের মহত্ততাকে নত মস্তকে স্বীকৃতি জানাতে পারি, সন্তানের কাছে বাবার যতখানি প্রাপ্য, তার কিঞ্চিৎ অংশটুকুও দেওয়ার চেষ্টা করতে পারি। এইজন্যই একটি বাবা দিবস দরকার, এবং `বাবা দিবস` এর প্রয়োজন আছে।

কিশোরীবেলায় শোনা হেমন্ত মুখার্জী ও শ্রাবন্তী মজুমদারের দ্বৈতকণ্ঠে গাওয়া গান, ‘মনে হয় বাবা যেনো বলছে আমায়, আয় খুকু আয়’ এখনও আমাকে কাঁদায়। আমার সত্যি সত্যি মনে হয় আমার বাবা আমাকে পেছন থেকে ডেকেই চলেছেন, আমার যে কোনো প্রয়োজনে বাবা যেনো আমাকে এখনো সাহস দিচ্ছেন, ভরসা দিচ্ছেন। মা’কে নিয়ে কত কাব্য রচিত হয়েছে, কত গীত রচিত হয়েছে বহুকাল আগে থেকে। কিন্তু বাবাকে নিয়ে তেমন করে কাব্যগাঁথা রচিত হয়নি। তাই বলে `বাবা`রা কি থেমে আছেন! বাবা নামের জীবন নৌকার মাঝিটি কিন্তু শক্ত হাতে নৌকার হালটি ধরেই আছেন। আজকের এই দিনে পৃথিবীর সকল বাবাকে সম্মান জানাই। সকল বাবার জন্যই আমাদের ভালোবাসা।

লেখক: মার্কিন প্রবাসী প্রাবন্ধিক

নতুনসময়.কম এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আপনার মন্তব্য লিখুন: