৩ পৌষ ১৪২৪, সোমবার ১৮ ডিসেম্বর ২০১৭, ৯:২৪ পূর্বাহ্ণ
bangla fonts
facebook twitter google plus rss
Natun Somoy logo

সিনেমা তৈরি

‘বৌকে গ্রামে পাঠিয়ে প্রোডাকশন হাউজে থাকতাম’


১৯ জুন ২০১৭ সোমবার, ০১:০৮  পিএম

নতুনসময়.কম


‘বৌকে গ্রামে পাঠিয়ে প্রোডাকশন হাউজে থাকতাম’

রিয়াজুল মওলা রিজু। সংক্ষেপে রিয়াজুল রিজু। ২০১৫ সালে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে `বাপজানের বায়োস্কোপ`-এর জন্য সেরা পরিচালকের পুরস্কার জিতেছেন তিনি। এটি ছিল তার নির্মিত প্রথম ছবি। আর প্রথম ছবিতেই করলেন বজিমাত। নতুন সময়ের সঙ্গে আলাপকালে নিজের ‘উঠে’ আসার গল্প শুনিয়েছেন ইমতিয়াজ মেহেদী হাসানকে।

নতুন সময় : মিডিয়ায় আপনার শুরুটা কিভাবে?

রিজু : হাইস্কুলে পড়াকালীন সময়ে টাঙ্গাইলের শিবনাথপড়ার ধুমকেতু নাট্যগোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত হই। যতদূর মনে পড়ে আমার প্রথম মঞ্চ নাটক ছিল ‘ফেরারী নিশান’। এরপর ইউনিসেফ, সেভ দ্য চিলড্রেনের হয়ে বেশ কিছু পথনাটক করি। নেশাটা আরো প্রগাঢ় হয়। ‘ত্রিবেণী’ সংগঠণের ব্যানারে শুরু করি টানা পথ নাটকের কাজ। সবমিলিয়ে প্রায় দু’ আড়াই হাজার পথনাটক করি। শুরুটা তখন থেকেই।

নতুন সময় : এরপর?

রিজু: ২০০৩-০৪ এর দিকে ঢাকায় আসি। এটিএন বাংলার একটি প্রোগ্রামের শুটিং দেখি। কিন্তু ক্যামেরা, প্রোডাকশন ওসব আমাকে তখন টানেনি। কারণ আমি মঞ্চের মানুষ। তারপর নিমকো, ডিএফআই থেকে চলচ্চিত্র তৈরির উপর প্রশিক্ষণ নেই। বিভিন্ন শুটিং সেটে গিয়ে ঘুরে ঘুরে ডিরেক্টরদের কাজ দেখতাম। ফ্রেমিং শিখতাম। কিভাবে কোন শর্ট রাখা হচ্ছে, কাটা হচ্ছে সেগুলো মনোযোগ দিয়ে খেয়াল করতাম। পরে শাহেদ শরীফ খানের নাটকে তার সহযোগী হিসেবে কাজ করি।

নতুন সময় : নিজে কবে পুরোদমে কাজ শুরু করলেন?

রিজু: আমার শুরুটা একটু অন্যরকম। সবাই প্রথমে একক নাটক বানালেও আমি বানিয়েছিলাম ধারাবাহিক। সেটা ২০১০ সালের ঘটনা। খুব সম্ভবত সেটি এখনকার জনপ্রিয় অভিনেত্রী মেহজাবিনেরও প্রথম কাজ ছিল। এরই ধারবাহিকতায় ২০১৩ পর্যন্ত বেশ কিছু নাটক টেলিফিল্ম বানাই। পরে ওই বছরই এসএ টিভিতে যোগ দেই প্রোগ্রাম প্রডিউসার হিসেবে।

নতুন সময়:  শোনা যায় সিনেমা নির্মাণের টানে আপনি চাকরি ছেড়েছেন? কথাটা কতটুকু সত্য?

রিজু : ‘চারপাশ’ নামে আমি তখন এসএ টিভিতে পেশাজীবীদের নিয়ে ডকুমেন্টারি প্রোগ্রাম করি। হঠাৎ একদিন শুটিংয়ে একটি চরে একজনের সঙ্গে পরিচয় হয়, যিনি বায়োস্কোপ দিয়ে মানুষদেরকে আনন্দ দিতেন। এই চাকরি থাকা অবস্থাতেই আমি ‘বাপজানের বায়োস্কোপ’ সিনেমাটি নির্মাণে হাতে দেই। কিন্তু শেষ পর্যন্ত চাকরিটা আর কন্টিনিউ করতে পারিনি। এরপর সিনেমা তৈরির নেশায় বউ বাচ্চাদের গ্রামের বাড়ি পাঠিয়ে দেই। অ্যাপার্টমেন্ট ছেড়ে রাতে গিয়ে থাকতাম নিজের প্রোডাকশন হাউসে।

নতুন সময় : এরপরেই তো প্রথম ছবিতেই বাজিমাত। এলেন, বানালেন, জয় করলেন এর মত। কি  বলেন?

রিজু : বাজিমাত হলো কিনা, তা বলতে পারব না। তবে অনেক দরদ নিয়ে একটা ‘গুড’ ফিল্ম নির্মাণ করেছি। চেষ্টা করেছি, সর্বোচ্চ ভালোটুকু দেবার। এ কারণে অনেক বাঁধা এসেছে। কিন্তু দমে যাইনি। ওস্তাদ শাহেদ শরিফ খান, আমার বাবা ডা. জি মওলা ও এই ছবির নির্বাহী প্রযোজক এম এ হোসেন মঞ্জুর কাছে আমি কৃতজ্ঞ। তারা না থাকলে, সাহস না দিলে, ‘বাপজানের বায়োস্কোপ’ছবিটি নির্মাণ করতে পারতাম না।

নতুন সময় : পুরস্কারপ্রাপ্তির খবর পেলেন কিভাবে?

রিজু : চলচ্চিত্র সেন্সর বোর্ড থেকে আমাকে ফোন করে বিষয়টি জানানো হয়। ‘বাপজানের বায়োস্কোপ’ নিয়ে এক্সপেক্টেশন থাকা সত্ত্বেও আমি সেসময় নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছিলাম না।

নতুন সময় : আগে থেকে কিছু জানতেন না?

রিজু : আগে থেকে উড়ো কথা শুনছিলাম। কিন্তু বিশ্বাস করিনি। তবে খবরটি শোনার পর চমকে গিয়েছি।

নতুন সময় : বিশেষ কাউকে কৃতজ্ঞতা জানানোর আছে কি?

রিজু : ওস্তাদ, আমার বাবা, বৌ ও প্রযোজকের পরে আমি তথ্যমন্ত্রনালয়, সরকার ও জুরি বোর্ডকে আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানাই ‘বাপজানের বায়োস্কোপ’ কে এতগুলো ক্যাটাগরিতে পুরস্কৃত করার জন্য।

নতুন সময় : ‘বাপজানের বায়োস্কোপ’ ছবিটি ২২টি ক্যাটাগরিতে পুরস্কারের শর্ট লিস্টে ছিল। সেখান থেকে ৯টি ক্যাটাগরিতে পুরস্কৃত হয়েছে। বিষয়টি আপনার কাছে কেমন লাগছে?

রিজু : এ অনুভুতি ভাষায় প্রকাশের মতো নয়। জীবনে এত বেশি অপ্রাপ্তি যে, এই সাফল্যটুকু মেনে নিতে একটু সময় লাগছে। তার চেয়ে বড় কথা-মোরশেদুল ইসলাম, অনিমেষ আইচ, শিহাব শাহীনদের মতো নির্মাতাদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে, আমি যে পুরস্কারটি পাবো সেটা ছিল কল্পনার বাইরে। ধন্যবাদ জানাচ্ছি সিনেমার পুরো টিমকে আমাকে সহযোগিতা করার জন্য।

নতুন সময় : ২০১৫ সালের ১৮ ডিসেম্বর ‘বাপজানের বায়োস্কোপ’ মুক্তি পেলেও ক’দিন পর হল থেকে ছবিটি নামানো হয়। কারণ কি?

রিজু : কারণ তো অবশ্যই আছে। একটি কুচক্রী মহল আমার নির্মাণশৈলী ও সাফল্যে ঈর্ষান্বিত হয়ে হল মালিকদের ভয়ভীতি দেখিয়ে ছবিটি বন্ধ করতে বাধ্য করেছিল। এরপর বিকল্প ব্যবস্থায় দেশের বিভিন্ন স্থানে ছবিটি প্রদর্শিত হয়।

নতুন সময় : ছবি তৈরির গল্পটা মাথায় এলো কিভাবে?

রিজু : অনেকদিন আগে চরাঞ্চল নিয়ে আমি ডকুমেন্টারি তৈরি করেছিলাম। তখন সেই অঞ্চলগুলোতে বায়োস্কোপওয়ালাদের দেখি। ভাবনাটা তখন থেকেই।

নতুন সময় : মাথায় আসা এই আইডিয়াটা তখন কারো সঙ্গে শেয়ার করেছিলেন?

রিজু : হ্যাঁ, চিত্রনাট্যকার মাসুম রেজা ও অভিনেতা শতাব্দী ওয়াদুদ ভাইয়ের সঙ্গে আইডিয়াটা শেয়ার করেছিলাম। তারা বললেন, টাকা-পয়সা ব্যাপার না, কাজটি করতে রাজি আছি। এরপরেই শুরু হল কাজের প্ল্যানিং।

নতুন সময় : এটি আপনার প্রথম চলচ্চিত্র। কিন্তু এই ছবিতে অনেক নতুন মুখকে কাজের সুযোগ দিয়েছেন। ব্যাপারটা আসলে কি?

রিজু : মাসুম রেজা, শহীদুজ্জামান সেলিম, শতাব্দী ওয়াদুদ, চন্দনা মজুমদার ছাড়া বাকিরা সবাই নতুন। এ ছবির জন্য আমি বিভিন্ন জেলায় ঘুরেছি, যখন যার সাথে যেভাবে পরিচয় ঘটেছে বা ভালো লেগেছে তখন তাকে মার্ক করেছি। আমার মনে হয়েছে একে দিয়ে এই কাজটি হবে, চরিত্র এবং আবহের সাথে খাপ খাবে, সেভাবেই তাকে এখানে সম্পৃক্ত করেছি। এর বাইরে কিছু নয়।

নতুন সময় : কাজের শুরুতে কোন প্রতিকূলতা এসেছিলো কি?

রিজু :  অনেক প্রতিকূলতা এসেছে।  তবে আমি মনে-প্রাণে বিশ্বাস করতাম, ভালো কিছু করতে হলে প্রতিকূলতা মেনে নিতে হবে। তাই বারবার হতাশ হয়ে আবার মানসিকভাবে শক্ত হয়েছি।

নতুন সময় : বারবার হতাশ মানে?

রিজু: সবকিছু যখন ঠিকঠাক। আর্টিস্ট-লোকেশন-প্রোডাকশন, তখন আমার হাতে টাকা নেই। চাকরি করি, যে ক’টা টাকা পাই তা দিয়ে সংসার চালাই। কিন্তু তারপরেও যা উদ্বৃত্ত ছিল সেটা নিয়েই কাজে নামি। সেটা আর কত? মাত্র ৬০ হাজার টাকা। তখনো কোনো প্রযোজক নেই আমার হাতে। তাই নিজের পকেটকেই সম্বল করে ১৫০ জনের ইউনিট নিয়ে শুরু করলাম আল্লাহর নামে শুটিং।

নতুন সময়:  শুটিংয়ের অভিজ্ঞতা কেমন ছিল?

রিজু: ভালো-খারাপ মিলিয়েই ছিল। তবে কিছু কথা একেবারে না বললেই নয়। সিরাজগঞ্জের এনায়েতপুর থানার লাঙলমোড়া গ্রামে আমাদের শুটিং চলছিল। সেখানে  মাঝে মাঝে ধুলোর ঝড় হয়। আমাদের পুরো ইউনিট একদিন সেই ভয়াবহ ধুলোর ঝড়ে পড়লাম। ইউনিটের অনেকেই অসুস্থ হয়ে পড়লেন। ঝড়ে তছনছ হয়ে গেল পুরো সেট। আবার যখন ঝড়ের ভেতর শুটিংয়ে যাচ্ছিলাম তখন যমুনা সেতুর উপর ট্রেন পড়ে গিয়েছিল। তখন আমরা ভয়ংকর বিপর্যয়ের মুখে পড়ি। ওই রাতে আমাদের সবাইকে না খেয়ে থাকতে হয়েছিল।

নতুন সময় : সে সময় তো একে আপনার প্রযোজক ছিলনা, তারওপর হল সেট লণ্ডভণ্ড। তখন কি করে এই সংকট অবস্থা পেরোলেন?

রিজু:  তখন আমি ভেতর ভেতর দিশেহারা হয়ে যাই। তবে বাইরে প্রকাশ করিনা। একপর্যায়ে বাধ্য হয়ে স্ত্রীর গহনাও বিক্রি করে দেই। যাতে বাইরের কেউ আর্থিক দুর্বলতার ব্যাপারটা না জেনে যায়। এরপর একদিন ভাবতে ভাবতে হঠাৎ মাথায় এলো সদ্য পরিচয় হওয়া ব্যবসায়ী এম এ হোসেন মঞ্জুর কথা। যেই ভাবা সেই কাজ, নিজের বিপদের কথা তাকে খুলে বললেন। মঞ্জু ভাই হাল ধরতে রাজি হলেন। ফের নব উদ্যমে শুটিং শুরু হলো।

নতুন সময় : অভিনয়শিল্পীরা কেমন সহযোগিতা করেছেন?

রিজু: চরাঞ্চলের ছবি এটি। এতে অভিনয় করাটা একটু টাফ। তবে সবাই খুব ভালো সহযোগিতা করেছেন। তারা হেল্প না করলে সিনেমাটি হয়তো শেষ করতে পারতাম না।

নতুন সময় : আপনি তো নিজেও অভিনয়ের মানুষ। মঞ্চ থেকে এসেছেন। কখনো কি মনে হয়েছে ‘নির্মাণ’ সহজ কাজ?

রিজু: নির্মাণ কিংবা অভিনয়, কোন কিছুই সহজ নয়। সবটাই মেধা আর পরিশ্রমের কাজ। আন্তরিকতার কাজ।  এগুলোর সুষম সমন্বয় হলেই কাজটা কাজের মত হয়।

নতুন সময় : জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার জিতেছেন, গুণী পরিচালকের তালিকায় এখন আপনার নাম। এরপর আপনি কী ধরনের ছবি নির্মাণে মনোযোগি হবেন?

রিজু: নিজে গুণী কিনা জানিনা, তবে চেষ্টাটা আছে দর্শকদের ‘ভালো’টা দেয়ার। আর আমার মতে মোট তিন ধরনের ছবি আছে। এগুলো হল গুড ফিল্ম, হিট ফিল্ম ও ব্যাড ফিল্ম। প্রথমটি নির্মাণ করেছিলাম ‘গুড ফিল্ম’ভাবনা নিয়ে। এবার নির্মাণ করব হিট ফিল্মের ভাবনা নিয়ে।

নতুন সময়: সেই ভাবনা কতটা এগুলো?

রিজু: গল্প-লোকেশন-অভিনয়শিল্পী-সেটসহ নানা বিষয়ের প্রাথমিক ভাবনা শেষ। আশা রাখছি শিগগিরই সবাইকে শুভ সংবাদ দিতে পারব।

নতুন সময় : যতদূর জানি, পেশায় আপনি একজন হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসক। মহান সেই পেশা ছেড়ে সিনেমা তৈরিতে এলেন কেন?

রিজু :  শুধু আমি নই, আমার বাবাও হোমিও ডাক্তার। টাঙ্গাইলে তার অনেক সম্মান আছে। যদি আবার হোমিও চিকিৎসা শুরু করি, ভালোভাবেই চলতে পারবো। কিন্তু সিনেমার প্রতি ভালোবাসাই আমাকে টেনে নিয়ে যায়। সেই ভালোবাসা থেকেই আমার সিনেমা তৈরি। আমৃত্যু সিনেমা তৈরি করে যেতে চাই।

নতুন সময় : আমাদের দেশীয় চলচ্চিত্রের  ডিস্ট্রিবিউশন এবং প্রদর্শনের জায়গাটা বেশ ঘোলাটে। এ থেকে মুক্তির উপায় কি?

রিজু:  টেলিভিশন চ্যানেলের মত একটা কেন্দ্রীয় সার্ভার হলে ভেতর থেকে থার্ড পার্টি আর সিনেমা ধ্বংস করতে পারবেনা। এতে নির্মাতা-প্রযোজকরা লাভবান হবেন। শিল্প লাভবান হবে। চলচ্চিত্রে ফিরবে সুদিন।

‘বাপজানের বায়োস্কোপ’ চলচ্চিত্রটি দেখতে-

নতুনসময়.কম এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আপনার মন্তব্য লিখুন: