৪ কার্তিক ১৪২৪, শুক্রবার ২০ অক্টোবর ২০১৭, ৩:৫২ পূর্বাহ্ণ
bangla fonts
facebook twitter google plus rss
Natun Somoy logo

বিচ্যুতি


০৯ অক্টোবর ২০১৭ সোমবার, ০৬:২৩  এএম

সত্যজিৎ কাঞ্জিলাল 

নতুনসময়.কম


বিচ্যুতি

সেদিন ছিল মধুরাত্রি। বিলাসবহুল বাড়ির দোতলার এক কোণের ঘরটিতে সাজসজ্জার বাহুল্য না থাকলেও ছিল মুক্তির আনন্দ। বদ্ধ ঘরেও দমবন্ধ লাগছিল না অনিন্দিতার। জানালার কাঁচ ভেদ করে মেঘের গুরু গুরু আওয়াজটা কর্ণকুহরে মধুবর্ষণ করছিল। অন্যদিন হলে সে ছাদে চলে যেত বৃষ্টিতে ভিজতে। তারপর স্নানাগারে এসে ভেজা জামায় লেপ্টে থাকা নিজের দেহ দেখে হেসে দিত ফিক করে। কিংবা জানালা দিয়ে হাত বাড়াত বৃষ্টি ছুঁয়ে দেখতে। অনিন্দিতার আজ কিছুই করতে ইচ্ছে করছে না। সে মনে মনে আশা করছে প্রচন্ড আওয়াজে একটি বাজ এসে পড়ুক ধরণীতলে। প্রিয়তমকে বাহুবন্ধনে আবদ্ধ করার এর চাইতে রোমাঞ্চকর উপায় কি আছে?

মধুরাত্রিতে প্রিয়তম বসে আছে একটু ফাঁকে। তার মনযোগ অন্য কোথাও।

আগে থেকেই অনিনন্দিতার কাছে আসতে চাইত না ও। খুব বেশি হলে হাতটা একটু ধরত। জোছনা রাতে প্রেমিকাকে কবিতা পড়ে শোনানো প্রেমিক নয় রাহুল। আকাশ ভেঙে বর্ষা নামলে তার হৃদয়ে প্লাবন নামে না। বরং পৃথিবী থেকে নিজেকে সরিয়ে রাখা এক উদভ্রান্ত যুবক ছাড়া আর কিছুই মনে হতো না তাকে। বিত্ত বৈভবের মধ্যে বড় হওয়া ছেলেটির কীভাবে যেন ঐশ্বর্যবান এক প্রেমিকা জুটে যায়। অদ্ভুত কারণে সেই প্রেমিকা থেকে দূরে সরে থাকতেই যেন প্রেমিকের যত চেষ্টা। দূরে বসে থাকা প্রেমিকের দিকে তাকিয়ে মুখ গোমড়া করে অনন্দিতা। 

‘আর কত সময় লাগবে’-প্রশ্ন করতেই রাহুল ব্যস্ত হয়ে বলে উঠে-‘এইতো আসছি..। ’

এ কেমন প্রেমিক, কেমন বর? ভেবে পায়না নববধু। ভাবার অবকাশ পায়না সে; তার আগেই প্রকৃতিদেবী প্রসন্নচিত্তে সবচেয়ে মধুময় সময়টির উপলক্ষ এনে দেয়। আকাশ ভেঙে, ধরণী কাঁপিয়ে প্রচন্ড শব্দে ধ্বনিত হয় বজ্রনিনাদ। অনিন্দিতা ঝাঁপিয়ে পড়ে বিছানার এক কোণে বসে থাকা অর্ধাঙ্গের উপর। অথৈ সমুদ্র কূল হারিয়ে হাবুডুবু খেতে থাকা অনিন্দিতা এই ছেলেটিকে আকঁড়ে ধরেছিল। ঘৃণায় ভরে থাকা হৃদয়ের সবটুকু শুন্য করে স্থান দিয়েছিল পুরুষটিকে। আজ মধুরাতে কী হলো সেই পুরুষটির। পাগলিনী নববধু ঝাঁপিয়ে পড়েছে। প্রেমিক পড়ে আছে নিস্তেজ, নিস্তরঙ্গ! আবেগের বাঁধ একসময় ভাঙে। জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকায় অনিন্দিতা। তার ওই শান্ত চোখের দিকে তাকিয়ে অপরাধীর মত কাঁপা কাঁপা কন্ঠে প্রেমিক জানায় নিজের দেহাংশ বিচ্যুতির কাহিনী!

পৃথিবীর সমস্ত প্রশ্ন, সমস্ত স্তব্ধতা, সমস্ত বিস্ময় এসে ভর করে অনিন্দিতার মনে। তার শান্ত দৃষ্টিতে স্থান করে নেয় ভয়, আতংক, ঘৃণা! চিত্কার না করে নিশ্চুপ প্রেমিকের দুকাঁধে হাত রেখে প্রেমিকা শুধায়-কীভাবে? অস্ফুট কণ্ঠে প্রেমিক বলে-‘অ্যাক্সিডেন্ট’! নববধুর বিশ্বাস হতে চায় না। নানা অবিশ্বাস ভর করে তার মাথায়। এজন্যই কি এতদিন দূরে দূরে থাকা? লেকের ধারে হাত ধরে হাঁটার বদলে আঁড়চোখে অন্য জুটিদের চুম্বনদৃশ্য দেখে দীর্ঘশ্বাস ফেলা? স্তব্ধ হয়ে যায় অনিন্দিতা। সামনে অপরাধীর মত বসে থাকে রাহুল। এত বড় প্রতারণা! ভেবে পায়না অনিন্দিতা। অনেক স্বপ্ন নিয়ে সাজাতে যাওয়া জীবন শুরুতেই প্রচণ্ড আঘাতে ছিন্ন হয়ে যায়। ভয়ানক হাহাকার এসে ভর করে বিলাসী বাড়িটিতে। বাড়ির কোনো এক ঘরে শুয়ে রাহুলের বাবা-মার ও নির্ঘুম রাত কাটে। তারাও তো জানত, কী হতে যাচ্ছে!

সকালে উঠেই ব্যাগ গোছাতে শুরু করে অনিন্দিতা। চা দিতে আসে বাড়ির কাজের মেয়েটি। এরপর আসে রাহুলের বাবা-মা। আসে রাহুল। কেউ বাঁধা দিতে পারে না। ব্যাগ গোছানো শেষ হয়। এমন সময় সংহার মূর্তি ধারণ করে পথ আগলে দাঁড়ায় রাহুলের মাতা। ছেলে বউয়ের প্রতি নিজের শেষ শক্তি প্রয়োগ করে নির্দেশ প্রদান করে। অনিন্দতা চাপা ক্রোধে গর্জে উঠে-“কার সাথে থাকব? একজন নপুংসকের সাথে? একজন প্রতারকের সাথে?” মা সরে যায়। এবার পা জড়িয়ে ধরে রাহুল। চোখ বেয়ে নেমে আসা ঝর্ণায় ভিজিয়ে ভোলাতে চায় অনিন্দিতাকে। এই দৃশ্য শুরু হতেই চলে যায় বাকিরা। অনিন্দিতার বোঝার কিছু নেই। শোনার ইচ্ছেও শেষ হয়ে গেছে বহুদিন। বাচ্চাদের মত কাঁদতে থাকা এক সময়ের প্রেমিকটির ব্যাকুলতা থামাতেই হয়ত ব্যাগটি ছুঁড়ে দেয় ঘরের ভেতর। পরিবেশ শান্ত হয়ে আসে। শাশুড়ির আদরও বেড়ে যায়। আসে অনেক রকমের খাবার। শাশুড়ি নিজে হাতে পরিবেশন করে বউমাকে। বসার ঘর থেকে কম্পিউটার চলে আসে রাহুলদের শোবার ঘরে। আসতে থাকে আরও বিলাসদ্রব্য। প্রতারক গৃহে আদরের বাহুল্যে অতিষ্ঠ অনিন্দিতা নিষেধ করতে করতে ক্লান্ত হয়। একসময় রাহুল চলে যায় বাইরে। নিঃসঙ্গ অনিন্দিতা বসে ভাবতে থাকে জীবনের আরকেটি ক্রান্তিকাল নিয়ে।

আজ দিনটা ছুটি নিয়েছিল অনন্দিতা। প্ল্যান ছিল দুজনে মিলেই দিনটা কাটাবে। কিন্তু পরিস্থিতি এখন ভিন্ন। অনিন্দিতা ঠিক ভেবে পাচ্ছে না তার কী করা উচিৎ। কেনই বা সে থেকে গেল তা নিজেও জানে না অনিন্দিতা। বাড়ির কেউ কথা বলতে আসে না। হয়তো লজ্জায়, সংকোচে, কিংবা ভয়ে। কখনো জানালার পাশে, কখনো শয্যাপাশে শুয়ে বসে নববধুর সময় কাটে। পৃথিবীর সমস্ত প্রশ্ন এসে একটি বাক্যে রুপ নেয়? ‘অ্যাক্সিডেন্ট? কারণ হিসেবে কতটা যৌক্তিক?’ অস্থিরতা বাড়তে থাকে। প্রশ্নের ভেলায় ভেসে যায় ওর হৃদয়ে জমে থাকা আবেগের শেষাংশ। একসময় কম্পিউটারের দিকে চোখ পড়ে। চেয়ারে বসে ও কিছু একটা খুঁজতে থাকে অন্তর্জালের অন্তহীন দুনিয়ায়। নজরদারি করতে আসা কাজের মেয়েটি দরজায় আড়ি পেতে শুনতে পায় কি-বোর্ডের খট খট আওয়াজ। সেই আওয়াজ একসময় থেমে যায়। স্তব্ধতা নেমে আসে ঘরময়।

রাহুল যখন বাড়িতে ফিরে তখন সূর্য অস্ত যাচ্ছে। অনিন্দতার ঘরে চাপা কান্নার হাহাকার। ত্রস্ত পায়ে নবপরিণীতার সামনে গিয়ে দাঁড়ায় সে। অনিন্দিতা ঝংকার দিয়ে উঠে ওর শার্টের কলার চেপে ধরে! ক্রুদ্ধ কণ্ঠে বলে, “কী করেছিলে মেয়েটার সাথে? মেরে ফেলেছ? নাকি টাকা দিয়ে....!” রাহুল বিস্ফোরিত নেত্রে তাকায়। মুখে কথা সরে না। অনিন্দিতা ওকে টেনে নিয়ে যায় কম্পিউটারের সামনে। নিজের অপরাধের বিবরণের সামনে দাঁড়িয়ে চোখে ঝাপসা দেখে রাহুল। অনিন্দিতা আরও জোরে চেঁচিয়ে বলে, “বলো কী করেছিলে মেয়েটির সাথে?” রাহুল কিছু বলতে পারে না। আবারও পা ধরাধরি পর্ব শুরু হয়। অস্ফুট কণ্ঠে চলতে থাকে ক্ষমা প্রার্থনা। পুত্রবধুর চিত্কার শুনেও ছুটে আসেনা ওর বাবা-মা। অসহায় রাহুল একাকী নিমগ্ন হয় স্ত্রীর মানভঞ্জনে।

হঠাৎ রাহুলের থেকে নিজের পা ছাড়িয়ে নেয় অনিন্দিতা। বিছানার উপর বসে স্থির দৃষ্টিতে তাকায় সাষ্টাঙ্গে বসে থাকা স্বামী নামক এক প্রতারক পুরুষের দিকে। ঠান্ডা গলায় বলতে থাকে নিজের অপ্রকাশিত কথা। হ্যাঁ, সে ও তো একরকম প্রতারণাই করেছে। এতদিনেও একটা কথা সে বলতে পারেনি রাহুলকে। কৈশোরের উদ্দাম সন্ধিক্ষণে তাকে ছিঁড়েখুড়ে খেয়েছিল রাহুলের মতই কোনো এক বিকৃত পুরুষ। সে আবার তার আত্মীয়ও বটে! না, এজন্য নিজেকে অপরাধী ভাবেনি অনিন্দিতা। বরং পরিবারের আদালতে প্রকাশ করেছিল সেই বিকৃত কাহিনী। কিন্তু অদ্ভূতভাবে নীরব থাকে সবাই। কেউ উকিল হয়ে অনিন্দিতার পাশে দাঁড়ায়নি। এতবড় একটা অন্যায় চাপা পড়ে গিয়েছিল সমাজের নোংরা সংস্কারের ভারে। বিচারকের গৃহবন্দিত্ব আদেশ প্রত্যাখ্যান করার সাহস দেখিয়েছিল অনিন্দিতা। এই দুঃসাহস দেখাতে গিয়ে বিষিয়ে উঠেছিল জীবন। তবু হার মানেনি সে। সংগ্রামমুখর জীবনের এক পর্যায়ে রাহুলকে দেখে কেন তার ভাল লেগে গেল সে নিজেও জানে না। প্রেম হয়ত এভাবেই আসে জীবনে। সেই প্রেমিক কী এখন মেনে নেবে অনিন্দিতার দুঃসহ অতীত?

প্রেমিকের কণ্ঠ থেকে ঘৃণার সাথে উচ্চারিত হয় ‘ছিঃ’! হো হো করে ঘর কাঁপিয়ে হেসে উঠে অনিন্দিতা। সে জানত কোনো সবল সক্ষম পুরুষ কিংবা অবলা অক্ষম মহিলা তার এই অতীতকে ঘৃণা করতে পারে। কিন্তু একজন অক্ষম দুর্বল অপরাধী নপুংসক পুরুষের কাছেও একজন নিপীড়িতার স্থান একই রকম-এটা ছিল ভাবনার বাইরে! এই পুরুষগুলো অনেক দোষ বের করতে পারবে তার। সবার আগে পোশাক, কাপড়ের দৈর্ঘ্য-প্রস্থ-উচ্চতা, তারপর চোখের চাউনি, কোমরের দুলুনির মাত্রা, হেসে হেসে কথা বলা আরও কত কী। কিংবা কোনো কিছু না পেলেও হয়ত বলবে, ‘কিছু একটা নিশ্চয়ই ছিল’। আজ এমনি একজন অপরাধী-যে তার অপরাধের চিহ্ন নিজের শরীর বহন করে চলছে তাকে আগলে রাখছে তার বাবা-মা। আগলে রাখছে সমাজ!

শেষ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারেনি রাহুল। তাই সশব্দে ঘরের দরজা খুলে যায়। পথ আগলে দাঁড়ানোর কেউ থাকেনা।

নতুনসময়.কম এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আপনার মন্তব্য লিখুন: