৪ পৌষ ১৪২৪, মঙ্গলবার ১৯ ডিসেম্বর ২০১৭, ২:২৩ পূর্বাহ্ণ
bangla fonts
facebook twitter google plus rss
Natun Somoy logo

রোহিঙ্গা সংকট

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বিপদ কোথায়?


১০ অক্টোবর ২০১৭ মঙ্গলবার, ১২:১১  পিএম

সেলিম রায়হান

নতুনসময়.কম


বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বিপদ কোথায়?

বাংলাদেশে রোহিঙ্গা শরণার্থী-সংক্রান্ত সাম্প্রতিক পরিস্থিতি পুরোপুরিভাবেই অনাকাঙ্ক্ষিত। এটা অনস্বীকার্য যে এ ঘটনা দেশের অর্থনীতি, রাজনীতি, সমাজ ও সার্বিক নিরাপত্তার ওপর চাপ সৃষ্টি করেছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এ চাপ আরও বাড়তে পারে। স্বাভাবিকভাবেই, বাংলাদেশ এ পরিস্থিতি মোকাবিলা করার জন্য প্রস্তুত ছিল না। মিয়ানমারের রোহিঙ্গাদের ওপর গণহত্যা এবং বিশালসংখ্যক রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী বাংলাদেশে আশ্রয় গ্রহণের ঘটনায় বাংলাদেশ যে ধরনের মানবিক সাহায্যের পদক্ষেপ নিয়েছে, তা সারা বিশ্বে প্রশংসিত হয়েছে। বাংলাদেশ সীমিত সম্পদ নিয়ে এই সংকটের মোকাবিলা করার চেষ্টা করছে। তবে রোহিঙ্গা সংকটকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের অর্থনীতি বেশ কিছু চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয়েছে, যার বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।

এই সংকটের এই মুহূর্তের চ্যালেঞ্জ হচ্ছে যে বিশাল শরণার্থীর ভরণপোষণের ব্যবস্থা করা। বিশ্বব্যাংকের ‘মাঝারি’ দারিদ্র্য আয়সীমা অনুযায়ী এক ব্যক্তির পেছনে প্রতিদিন যদি ৩ দশমিক ১ মার্কিন ডলার খরচের হিসাব করা হয় এবং বর্তমানে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের সংখ্যা যদি ১০ লাখ হয়, তবে বছরে তাদের পেছনে খরচ হবে ন্যূনতম প্রায় নয় হাজার কোটি টাকা। এটা কোনোমতেই সহজ কোনো বিষয় নয়।

এখন হয়তো বিশ্বের অনেক দেশই ত্রাণসামগ্রী নিয়ে এগিয়ে আসছে। তবে যে পরিমাণ সাহায্য বা ত্রাণের কথা বলা হচ্ছে, তা নিতান্তই সীমিত। এক হিসাবে এই ত্রাণের অর্থের পরিমাণ বছরে প্রয়োজনীয় অর্থের ৫ শতাংশও নয়। স্বল্প মেয়াদে অর্থনীতির বিশ্লেষণে বড় ধরনের বোঝা মনে হবে না এই অর্থে যে মোট জনগোষ্ঠীর তুলনায় ১০ লাখ লোক হয়তো শতকরা হিসাবে তেমন উল্লেখযোগ্য নয়, কিন্তু যখন আমরা দীর্ঘ মেয়াদে চিন্তা করব, তখন একটা বড়সড় প্রভাব আমাদের চোখে পড়বে।

সবচেয়ে বড় বিষয় হচ্ছে, এই মুহূর্তে রোহিঙ্গা ইস্যুতে বিশ্ববাসীর যে দৃষ্টি রয়েছে অথবা সংবাদমাধ্যমগুলোর শিরোনামে যা লক্ষ করা যাচ্ছে, তা কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে হ্রাস পাবে বা হারিয়ে যাবে। তাতে ক্রমবর্ধমানভাবে বহির্বিশ্ব থেকে যে পরিমাণ ত্রাণ বা সাহায্য আসছে, তা কমে যাবে বা একটা সময়ের পর থেমে যাবে। এর অর্থ হচ্ছে, এ সংকটের নিরসন না হলে দীর্ঘ মেয়াদে বাংলাদেশকেই এর ব্যয়ভার বহন করতে হবে। একটি বড় চিন্তার বিষয় হলো, এই শরণার্থীদের মধ্যে একটা বিশাল অংশ শিশু এবং আগামী এক বছরে প্রায় ৫০ থেকে ৬০ হাজার শিশু জন্ম নেবে। এই শিশুদের স্বাস্থ্য, খাদ্য, বাসস্থান ও শিক্ষার ব্যবস্থা বাংলাদেশকেই করতে হবে।

অদূর ভবিষ্যতে রোহিঙ্গা সংকটে চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে পর্যটনশিল্পে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। আসন্ন পর্যটন মৌসুমেই এর প্রভাব স্পষ্ট হবে। নিরাপত্তার সংকট তৈরি হলে কক্সবাজারের পর্যটনকেন্দ্রেও তার বিরূপ প্রভাব পড়বে। চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে, বিশেষ করে চট্টগ্রাম বন্দর ঘিরে কয়েকটি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠা, গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণসহ প্রস্তাবিত কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের বাস্তবায়নের ওপর বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক উন্নয়ন নির্ভর করছে। এসব প্রকল্পে বড় ধরনের দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগের সম্ভাবনা রয়েছে। যদি এ অঞ্চলের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়, তবে তা প্রকল্পগুলোতে দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের বিনিয়োগে নিরুৎসাহিত করতে পারে, যা বাংলাদেশের উন্নয়ন পরিকল্পনায় বাধা হয়ে দাঁড়াবে। এটা সমগ্র দেশের অর্থনীতির ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে।

বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ উন্নয়ন পরিকল্পনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে আঞ্চলিক বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও বৃহত্তর পরিসরে আঞ্চলিক সহযোগিতা বৃদ্ধি করা। চীনের সঙ্গে প্রস্তাবিত বিসিআইএম অর্থনৈতিক করিডর বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের অর্থনীতির ওপর বড় ধরনের ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। পাশাপাশি আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের আঞ্চলিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সহযোগিতার ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। এই উদ্যোগগুলোর মধ্যে রয়েছে রাস্তা ও রেলপথের যোগাযোগ, যার সবই মিয়ানমারের ভেতর দিয়ে গিয়েছে। অতএব, রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে সম্পর্কের অবনতি হলে পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে আঞ্চলিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের প্রচেষ্টাকে ব্যাহত করতে পারে।

স্বাধীনতার পর থেকে গত কয়েক দশকে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির যে ধারা, তা অনেক ঈর্ষণীয় এবং অনেক দেশের তুলনায় তা অনেক এগিয়ে। এই প্রবৃদ্ধি অর্জনের ক্ষেত্রে একটি বিষয় কাজ করেছে আর তা হলো বাংলাদেশ এই সময়ে প্রতিবেশী কোনো দেশের সঙ্গে কোনো ধরনের বাহ্যিক সংঘর্ষে জড়ায়নি অথবা জড়ানোর মতো কোনো আশঙ্কা তৈরি হয়নি। দক্ষিণ এশিয়ার দুটি বড় রাষ্ট্র ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব বিভিন্ন সময়ে চরমে পৌঁছেছে এবং এই দুটি দেশের অভ্যন্তরীণ উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে এই রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব নানাভাবে বাধার সৃষ্টি করছে। বাংলাদেশ এখন পর্যন্ত এ ধরনের সমস্যা থেকে মুক্ত। এখন মিয়ানমারের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে একধরনের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে যে এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব বাংলাদেশের উন্নয়ন পরিকল্পনায় একধরনের কালো ছায়া ফেলতে পারে।

এরই পরিপ্রেক্ষিতে বর্তমান পরিস্থিতি বাংলাদেশে সামরিক ব্যয়বৃদ্ধির ঝুঁকি সৃষ্টি করেছে, যা দেশের উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে প্রভাব ফেলতে পারে। বাংলাদেশের সামরিক ব্যয় অন্য প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় অনেক কম। বর্তমানে বাংলাদেশের সামরিক ব্যয় জিডিপির অনুপাত ১ দশমিক ৫ শতাংশ, যা ভারত ও পাকিস্তানে যথাক্রমে ২ দশমিক ৫ শতাংশ ও ৩ দশমিক ৬ শতাংশ। অথচ শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় এই দেশগুলোতে প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। দেশের সীমিত সম্পদ যদি সামরিক খাতের ব্যয়বৃদ্ধিতে ব্যবহৃত হয়, তবে অবধারিতভাবে তা দেশের স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও অন্যান্য উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে খরচ কমাবে। এটা বাংলাদেশের ২০৩০ সাল নাগাদ টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বাধার সৃষ্টি করবে।

উল্লেখ্য, বেশ কিছু দেশ, যারা আমাদের বন্ধুপ্রতিম ও শক্তিশালী রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিত কিন্তু রোহিঙ্গা ইস্যুতে পক্ষাবলম্বনে ইতস্তত করছে, তাদের সঙ্গে কুশলতার সঙ্গে কূটনৈতিকভাবে সম্পর্ক বিনির্মাণ প্রয়োজন। এখন পর্যন্ত মিয়ানমারের পক্ষ নিয়েছে চীন, রাশিয়া ও ভারত। কারণ, মিয়ানমারে তারা বিনিয়োগ করেছে এবং আরও বিনিয়োগ করতে চায়। রাখাইন রাজ্যে খনিজ সম্পদ এবং দক্ষিণ বঙ্গোপসাগরের ওপর আধিপত্য বিস্তারে চীন, ভারত, রাশিয়ার মধ্যে প্রতিযোগিতা রয়েছে।

আর এ রকমই একটা প্রতিযোগিতার ফাঁদে পড়েছে বাংলাদেশ। কিন্তু বাংলাদেশের এখন বুঝতে হবে বাংলাদেশের জন্য শক্তিশালী দর-কষাকষির জায়গাটি কোথায়। বাংলাদেশ প্রায় ১৬ কোটি মানুষ নিয়ে ভূরাজনীতির এমন একটা অঞ্চলে অবস্থান করছে, যেখানে ভারত, চীন, রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে অবহেলা করার সুযোগ নেই। এই দেশগুলোর একই সঙ্গে মিয়ানমার ও বাংলাদেশকে প্রয়োজন। বিষয়টিকে পুঁজি করে বাংলাদেশের উচিত কূটনৈতিক কুশলতা দেখানো এবং চীন, ভারত ও রাশিয়াকে রোহিঙ্গা সংকটের বিষয়ে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নিতে উদ্বুদ্ধ করা।

(প্রথম আলো)

সেলিম রায়হান: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক এবং সানেমের নির্বাহী পরিচালক।

selim.raihan@gmail.com

নতুনসময়.কম এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আপনার মন্তব্য লিখুন: