১০ আষাঢ় ১৪২৪, শনিবার ২৪ জুন ২০১৭, ৭:৫৬ অপরাহ্ণ
bangla fonts
facebook twitter google plus rss
Natun Somoy logo

পদ্মায় বিলীন হলো একমাত্র উচ্চ বিদ্যালয়টি


২২ সেপ্টেম্বর ২০১৬ বৃহস্পতিবার, ০৭:৩৫  পিএম

নতুনসময়.কম


পদ্মায় বিলীন হলো একমাত্র উচ্চ বিদ্যালয়টি

আবারও শুরু হয়েছে শরীয়তপুরের জাজিরার কুন্ডেরচরে পদ্মা নদীর রাক্ষুসী তাণ্ডব। দেড় হাজারেরও বেশি মানুষের বসতবাড়ি কেড়ে নেয়ার পর, পদ্মা এবার কেড়ে নিলো এই চরাঞ্চলের একমাত্র উচ্চ বিদ্যালয়ের পাকা ভবনটি।

ফলে জেএসসি, এসএসসি এবং বার্ষিক পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারী আট শতাধীক শিক্ষার্থী পড়েছে বিপাকে। অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে তাদের শিক্ষা কার্যক্রম। অবশ্য প্রশাসন বলেছে বিকল্প ব্যবস্থায় যাবতীয় শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে নেয়া হবে।

মঙ্গলবার সকাল থেকে সুর্যাস্তের পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত শত শত ছাত্র-ছাত্রীর আনন্দ উল্লাসে মুখরিত ছিল কুন্ডেরচর আলহাজ মো. ইসমাইল মেমোরিয়াল উচ্চ বিদ্যালয়টি। বুধবার সুর্যাদয়ের পূর্বেই ম্লান হয়ে গেছে সেই সব আনন্দ উল্লাস।

গভীর রাতে রাক্ষুসী পদ্মা কেড়ে নিয়েছে বিদ্যালয়ের নবমির্মিত একাডেমিক ভবনটি। বুধবার সকালে শত শত ছাত্র-ছাত্রীদের কান্নায় ভারী হয়ে উঠে কুন্ডেরচর পদ্মা পাড়ের আকাশ বাতাস। ৮ শতাধিক শিক্ষার্থীর প্রিয় বিদ্যালয়টি প্রকৃতির খাম খেয়ালীতে এভাবে হারিয়ে যাবে এটা তারা কিছুতেই মেনে নিতে পারছিল না।

সরেজমিনে পরিদর্শন করে এবং স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা যায়, জুলাই মাসের ২৫ তারিখ থেকে শুরু হয়েছে শরীয়তপুর জেলার জাজিরা উপজেলার কুন্ডেরচর ইউনিয়নে পদ্মা নদীর ভয়াবহ ভাঙন। ইতিমধ্যে কুন্ডেরচর ইউনিয়নের ৬, ৭, ৮ ও ৯নং ওয়ার্ডের হাজী মকবুল খালাসীর কান্দি, হাজী মোহাম্মদ খালাসীর কান্দি, চোকদার কান্দি, মোমিন খালাসীর কান্দি, আহমদ মোল্যার কান্দিসহ ৫টি গ্রাম সম্পূর্ণ নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে।

এছাড়া ইয়াকুব মাদবর কান্দি, ইউসুফ বেপারীর কান্দি ও রিয়াজ উদ্দিন মাদবরের কান্দি গ্রামের আংশিক বিলীন হয়েছে। শুধু তাই নয়, পার্শবর্তী নড়িয়া উপজেলার মোক্তারেরচর ইউনিয়নের গফুর বেপারীর কান্দি গ্রামের একটি বিশাল অংশ ইতিমধ্যে ভাঙনের কবলে পরে শতাধিক বসতবাড়ি ও স্থাপনা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে।



পদ্মা পাড়ের মানুষের সাথে আলাপকালে জানা যায়, গত ৫০ বছরের মধ্যে এ বছরই সবচেয়ে বেশি ভাঙনের কবলে পড়েছে তারা। প্রতি ঘণ্টায় পদ্মায় বিলীন হচ্ছে শত শত ঘরবাড়ি, গাছপালাসহ বিভিন্ন স্থাপনা।

জুলাই মাসের ২৫ তারিখের পর থেকে অন্তত ১ হাজার ৪ শতটি পরিবার তাদের সকল সহায় সম্পত্তি পদ্মা বক্ষে হাড়িয়েছেন। পাশাপাশি বিলীন হয়েছে ৯টি গ্রামের ৫টি পাকা জামে মসজিদ, দু’টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, একটি বড় বাজার, ৯ কিলোমিটার পাকা সড়ক, বিদ্যুতের লাইনসহ শত শত হেক্টর ফসলি জমি।

গত দুই মাস ধরে থেমে থেমে চলেছে এই নদীভাঙন। সাত দিন বিরতির পর মঙ্গলবার গভীর রাতে বিলীন হয়েছে কুন্ডেরচর আলহাজ মো. ইসমাইল মেমোরিয়ার উচ্চ বিদ্যালয়ের নতুন ভবনটি। যে ভবনটি মাত্র ৬ মাস পূর্বে ৬১ লাখ টাকা ব্যায়ে নির্মাণ করা হয়েছিল। শুধু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানই নয়, নতুন করে আবার ভাঙন ঝুঁকিতে পড়েছে রিয়াজ উদ্দিন মাদবর কান্দি গ্রামসহ কয়েকটি পাকা স্থাপনা।

স্কুল ভেঙে যাওয়ার কারণে পরীক্ষাসহ সার্বিক শিক্ষা কার্যক্রম নিয়ে চরম বিপদে পড়েছে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকরা। তারা বিকল্প ব্যবস্থায় শিক্ষা কার্যক্রম এবং পরীক্ষা চালিয়ে নিতে দাবি জানিয়েছে সরকারের প্রতি।
 
বিদ্যালয়টির শিক্ষার্থী সামিয়া আক্তার, রুবিনা আক্তার, পনির কুমার বাড়ৈ এবং কাওসার হোসাইন নতুন সময়কে বলেন, আমরা মঙ্গলবারও ক্লাস করেছি নতুন ভবনে। সারা দিন কাটিয়েছি স্কুল চত্বরে। আজ আমাদের স্কুলটি এভাবে ভেঙে যাওয়ায় আমরা অনেক সমস্যায় পড়েছি। আজ থেকে আমাদের মডেল টেষ্ট পরীক্ষা শুরু হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তা হয়নি। ক’দিন পরেই জেএসসি এবং এসএসসির নির্বাচনী পরীক্ষা শুরু হবে। এরপর বার্ষিক পরীক্ষা। সামনে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ক্লাস রয়েছে। স্কুলের ভবন না থাকলে আমরা ক্লাস করবো কীভাবে? আর ক্লাস করতে না পারলে পরীক্ষাইবা দেব কীভাবে? আমরা জরুরি ভিত্তিতে শিক্ষা কার্যক্রম চালু করার জন্য সরকারের কাছে অনুরোধ জানাচ্ছি।

নদী ভাঙায় ক্ষতিগ্রস্ত সমিরুদ্দিন মাদবর, ফিরোজা বেগম ও মতিউর রহমান খলিফা নতুন সময়কে বলেন, সর্বনাশা পদ্মা নদী আমাদের বসতবাড়ি, জমিজমা সবইতো নিয়ে গেছে। এর আগে দুইটি প্রাইমারি স্কুল বিলীন হয়েছে। এখন এলাকার একমাত্র হাই স্কুলটিও চলে গেল। দুই বেলা খাই না খাই, বাচ্চাদের পড়ালেখা যে করাবো সেই নিশ্চয়তাটুকুও আমরা হারিয়ে ফেললাম। সরকার যেন অতি শিগগিরই স্কুল নির্মাণের ব্যবস্থা করেন, এটাই আমাদের একমাত্র দাবি।



কলমীরচর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সাহানারা বেগম বলেন, গত ২৭ আগস্ট আমাদের স্কুলটি বিলীন হয়ে যাওয়ায় ইসমাইল মেমোরিয়াল উচ্চ বিদ্যালয় চত্বরে অবস্থিত আবুল হাশেম প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নিচ তলায় চার শতাধিক শিক্ষার্থীদেরকে নিয়ে পাঠদান কার্যক্রম কোনো রকমে চালিয়ে আসছিলাম। এখন সেই স্কুলটিও ভাঙনের ঝুকিতে রয়েছে। স্কুল থেকে নদীর দূরত্ব মাত্র ১০ ফুট। যেকোনো সময় ভেঙে যেতে পারে। এই স্কুলটি বিলীন হলে দুইটি বিদ্যালয়ের এতোগুলো শিক্ষার্থী নিয়ে আমরা কোথায় গিয়ে দাঁড়াবো ভেবে পাচ্ছি না।

কুন্ডেরচর আলহাজ ইসমাইল মেমোরিয়াল উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক দীপক কুমার দত্ত নতুন সময়কে বলেন, গত ১৭ ফেব্রুয়ারি আমাদের স্কুলের নতুন ভবনটি হস্তান্তর করা হয়। ৬১ লাখ টাকা ব্যয়ে ভবনটি নির্মাণ করা হয়েছিল। মাত্র ৫ মাস এই ভবনে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত করতে পেড়েছি। মঙ্গলবার গভীর রাতে নতুন এই পাকা ভবন পদ্মা নদীতে বিলীন হয়ে যায়। এখন প্রায় ৮শ শিক্ষার্থী নিয়ে আমরা চরম বিপাকে পড়েছি। এলাকায় সাহায্য করার মতো কেউ নেই। যারা সাহায্য করবে তাদেরও সব কিছু শেষ হয়ে গেছে নদী ভাঙনে। এখন জরুরি ভিত্তিতে সরকার যদি কোনো ব্যবস্থা না নেয় তাহলে শিক্ষার্থীদের নিয়ে মরা ছাড়া কোনো পথ থাকবে না।

এ ব্যাপারে শরীয়তপুরের জেলা প্রশাসক মো. মাহমুদুল হোসাইন খান এর সাথে আলাপকালে তিনি নতুন সময়কে বলেন, শিক্ষার্থীদের শিক্ষা কার্যক্রম যাতে প্রকার ব্যাহত না হয় সে জন্য, পার্শ্ববর্তী স্কুলে শিক্ষার্থীদেরকে শিফটিং পদ্ধতিতে শিক্ষা কার্যক্রম ও পরীক্ষা চালিয়ে নিতে ইউএনও এবং শিক্ষা কর্মকর্তাকে নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে।

নতুনসময়.কম এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আপনার মন্তব্য লিখুন: