১ ভাদ্র ১৪২৫, বৃহস্পতিবার ১৬ আগস্ট ২০১৮, ৮:০৯ পূর্বাহ্ণ
bangla fonts
facebook twitter google plus rss
Natun Somoy logo

নামাজটা পড়ে এসেই মন্দির পাহারা দেবো


২৯ আগস্ট ২০১৭ মঙ্গলবার, ০৯:২৪  পিএম

সমুদ্র সৈকত

নতুনসময়.কম


নামাজটা পড়ে এসেই মন্দির পাহারা দেবো

বাবা`র সরকারি চাকরির সুবাদে গত ২৫ বছরে আমার ১৫টি জেলায় বসবাসের সৌভাগ্য হয়েছে। `সৌভাগ্য` বললাম এই কারণে যে, এই ১৫টি জেলায় থাকার কারণেই নানা শ্রেণির বৈচিত্র্যময় মানুষ, তাদের ধর্মীয় আচার-উৎসব ও পারিপার্শ্বিক সমাজ ব্যবস্থার সাথে আমার পরিচয় হয়েছিলো। এই ১৫টি জেলার ভিতরে যেমন রাজধানী ঢাকার আধুনিক এলাকা ধানমন্ডিতে থেকেছি, তেমনি পিরোজপুরের নাজিরপুরের(তখন এই এলাকার সংসদ সদস্য ছিলো রাজাকার দেলওয়ার হোসেন সাঈদী) প্রত্যন্ত একটি গ্রামেও থেকেছি ২ বছর। তাই শহুরে ও গ্রাম্য সমাজ এবং সেই সমাজের মানুষদের মানসিকতার বিভিন্ন রূপ আমি বেশ কাছ থেকে দেখার সুযোগ পেয়েছি।

৯০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে আমরা যারা শৈশব পার করেছি, তাদের দৈনন্দিন জীবনে সাম্প্রদায়িক বৈষম্যের তেমন কোনো ব্যাপার ছিলো না। বিভিন্ন ধর্মের বন্ধু-বান্ধব, পাড়া-প্রতিবেশীদের সাথে আমাদের দারুণ সুসম্পর্ক ছিলো। ঈদ-পূজা-বড়দিনে সব বন্ধুরা মিলে একসাথে আনন্দ করা আমাদের জন্য ছিলো খুবই সাধারণ ব্যাপার। ঈদের দিন মুসলমান বন্ধুদের বাসায় গিয়ে সেমাই-বিরিয়ানী খাওয়া, দূর্গাপূজায় হিন্দু বন্ধুদের বাসায় গিয়ে নাড়ু-লুচি-পায়েশ খাওয়া, বড়দিনে খৃস্টান ধর্মের বন্ধুর বাসায় গিয়ে কেক খেতে খেতে ক্রিসমাস ট্রি দেখা বা বৌদ্ধপূর্নিমায় ফানুশ দেখতে যাওয়া আর প্রাণখুলে আড্ডা দেওয়া ছিলো আমাদের বাৎসরিক `গ্রুপ ওয়ার্ক`-এর অংশ। ঈদের বিকালে বন্ধুরা দলবেঁধে ঘুরতে যাওয়া আর দূর্গাপূজার রাতে মণ্ডপ ঘুরে ঘুরে প্রতিমা দেখা ছিলো আমাদের অত্যন্ত আকাঙ্ক্ষিত বিষয়। এছাড়াও আদিবাসীদের বিভিন্ন বৈচিত্র্যময় উৎসবের প্রতিও তখন আমাদের বেশ আগ্রহ থাকতো। রোজার মাসে সবাই মিলে ইফতার করার চর্চা এখনো খুব প্রচলিত। আমাদের হয়তো কখনো মাথায়ই আসতো না যে আমাদের পারিবারিক ধর্ম ভিন্ন। ‘ধর্ম যার যার, উৎসব সবার’- এই সহজ কথাটি সেই সময়ে আমাদের কখনো বলতে হতো না। এই ভিন্নতার সৌন্দর্যটুকু আমরা তখন খুব সরল মনে উপলব্ধি করতে পারতাম।

আমাদের শৈশবের সেই সুদিন এখন আর নেই। সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প আর বৈষম্য এখন আমাদের অতিষ্ট করে তুলেছে। একসময় এই উপমহাদেশে ধর্মের ভিত্তিতে দেশ ভাগ হয়েছে। পরবর্তীতে শোষণ-বৈষম্যহীন অসাম্প্রদায়িক একটা ভূখণ্ড পাওয়ার জন্য আমাদের দেশের ৩০ লক্ষাধিক মানুষ মুক্তিযুদ্ধে প্রাণ দিয়েছেন। পঁচাত্তর পরবর্তী রাজনৈতিক অধঃপতন দেশটাকে সাম্প্রদায়িকতার দিকে এগিয়ে নিয়ে গেছে ধীরে ধীরে, যার কুফল আমাদের এখন ভোগাচ্ছে। রাজনৈতিক নীতিহীনতার কারণে দেশবিরোধী রাজাকারেরা একসময় আমাদের দেশে মন্ত্রী-এমপি হয়েছে। তাদের বড়ধরণের অনুসারীও তৈরী হয়েছিলো। পরবর্তীতে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের অসাম্প্রদায়িক প্রজন্মের বিপরীতে ধর্মান্ধ একটি বোধহীন গোষ্ঠীর সৃষ্টি হয়েছিলো। ২০১৩ সালে শাহবাগে গণজাগরণ মঞ্চ`র আন্দোলন শুরু হবার পর এই আক্রমণাত্মক সাম্প্রদায়িকতার ব্যাপারটা আরো প্রকট হয়। ধর্মীয় ভিন্নমতের কারণে ধর্মান্ধ মৌলবাদীরা একের পর এক মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের প্রগতিশীল মানুষকে হত্যা করেছে, প্রাণ বাঁচাতে দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছে অনেকে।

এতোকিছুর পরেও একজন মুক্তিযোদ্ধার সন্তান হিশেবে আমি সবসময় বৈষম্যহীন অসাম্প্রদায়িক বাঙলাদেশের স্বপ্ন দেখি। এই দেশ কারো দয়ার দান না, ৩০ লক্ষাধিক মুক্তিকামী মানুষের জীবনের বিনিময়ে এই দেশটা পেয়েছি আমরা। এদেশে আস্তিক, নাস্তিক, আদিবাসীদের সবারই সমান অধিকার। এদের সবাই-ই নিজের দেশে মাথা উঁচু করে বাঁচবে। তবে, দেশবিরোধী ধর্মান্ধদের জন্য এদেশে কোনো জায়গা হবে না। একদিন এদের জায়গা হবে আস্তাকুড়ে। মৌলবাদীরা বিভিন্ন সময়ে নানারকম মিথ্যাচার করে মানুষদের বিভ্রান্ত করেছে, এখনো করছে। এসব বিষয়ে সচেতন থেকে মানবিকতার চর্চা করতে হবে, ভবিষৎ প্রজন্মকে সৎ, মানবিক ও পরমতসহিষ্ণুভাবে গড়ে তুলতে হবে, তাহলে ভবিষ্যতে আমাদের এই বাঙলাদেশ সত্যিই আর কখনো ভুল পথে হারাবে না।

আমি আশাবাদী মানুষ, আমি সবসময় সুদিনের আশায় থাকি। শুভশক্তির সবাই একসাথে জ্বলে উঠলে কী হতে পারে তা ২০১৩ সালে শাহবাগের আন্দোলনের সময় পৃথিবী অবাক হয়ে দেখেছে। শুভশক্তির পক্ষের একজন মানুষ সবসময়ই অশুভশক্তি লালন করা হাজারো মানুষের চেয়ে শক্তিশালী। এদেশে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হওয়ার মাধ্যমে প্রমাণ হয়েছে, অশুভশক্তি কখনো বেশীদিন টিকতে পারে না। আমাদের তরুণ প্রজন্মও এখন যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশী সচেতন। লাখ লাখ মানুষ এখন প্রতিনিয়ত অন্যায়ের বিরুদ্ধে স্বেচ্ছায় সোচ্চার হয়, প্রতিবাদ করে- এটাও কিন্তু বিরাট একটা ব্যাপার। বৌদ্ধ ধর্মের কয়েকজন প্রতিবছর পথচারী মুসলমান রোজাদারদের ইফতার বিতরণ করে। হিন্দু ধর্মের মানুষেরা দল বেঁধে ঈদগাহ পাহারা দিয়েছে। এরকম শতশত অসাম্প্রদায়িকতা আর মানবিকতার নজির রয়েছে আমাদের দেশে। ২০১৩ সালে রেহান চৌধুরী নামের একজন বলেছিলেন- ‘নামাজটা পড়ে এসেই মন্দির পাহারা দেবো, দেখি ভাঙতে কোন রাজাকার আসে।’

এই মানুষেরাই আমাদের সার্বজনীন, অসাম্প্রদায়িক, সহনশীল ও মানবিক বাঙলাদেশের স্বপ্ন দেখায়। এরাই বাঙলাদেশ।

লেখক: এক্টিভিস্ট, গণজাগরণ মঞ্চ

behumanefirst‬

নতুনসময়.কম এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আপনার মন্তব্য লিখুন: