৩০ শ্রাবণ ১৪২৫, বুধবার ১৫ আগস্ট ২০১৮, ৩:০৩ পূর্বাহ্ণ
bangla fonts
facebook twitter google plus rss
Natun Somoy logo

ধর্ম নয়, মানুষ হিসেবে মানুষের পাশে


১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৭ শুক্রবার, ১১:০৭  পিএম

সাইফুর রহমান

নতুনসময়.কম


ধর্ম নয়, মানুষ হিসেবে মানুষের পাশে

আন্তঃদেশীর রাজনীতি তুলনামূলকভাবে কম বুঝি তাই রোহিঙ্গা ইস্যুতে খুব একটা কিছু বুঝতে পারছিলাম না। তবে হাজার হাজার নিরীহ মানুষের ঢল দেখে খারাপ লাগছিল।

জাতি হিসেবে রোহিঙ্গাদের নিয়ে নানা রকম আলোচনা, সমালোচনা, বাজার গরম করা, লাইক কামানো টাইপ অনেক পোস্ট পড়েছি। পারতপক্ষে মন্তব্য করা থেকে বিরত থেকেছি।

আসুন কিছুটা পড়াশুনা করি সংক্ষেপে। রাখাইন রাজ্যের সংখ্যাগরিষ্ঠ বা অপেক্ষাকৃত বড় নৃগোষ্ঠীগুলোর মধ্যে রোহিঙ্গাদের সম্পর্কে ধারণা করা হয় সবচেয়ে বড়। আরাকান রাজ্যের মধ্যযুগীয় নাম ছিল রোহাং, প্রাচীন নাম রূহ্ম জনপদ। ১৫০০ খ্রীষ্টপূর্বে পূর্ব ভারত হতে অস্ট্রিক জাতির ‘কুরুখ’ নামক একটি অংশ প্রথম রাখাইনে যেয়ে বসতি স্থাপণ করে। এরা প্রথমে হিন্দু থাকলেও বিভিন্ন সময়ে পার্সি, আরবীয়, তুর্কী, মোঘল এবং পাঠানদের বঙ্গোপসাগরের উপকূলীয় অঞ্চলে বসতী স্থাপণ করা দরুন তাদের সাথে মিশে এবং তাদের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হয়। যতদূর জানা যায় ১০৪৪ খ্রিষ্টাব্দে কট্টরপন্থী বৌদ্ধ ধর্মী রাজা আনাওহতা আরাকান দখল করে মগদের বার্মা থেকে এবং দক্ষিণাঞ্চল থেকে রোহিঙ্গাদের বিতারিত করে বৌদ্ধ বসতি গড়ে তোলে।

মিয়ানমারের আরাকান রাজ্যের লিখিত ভাষাই হলো রোহিঙ্গা বা রাখাইন ভাষা। চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষার সাথে বেশ মিল থাকলেও এই ভাষাটি ইন্দো-ইউরোপীয়ান ভাষা গোষ্ঠীর অন্তর্গত।

নিজেদের আদিবাস নানান সময় দখল-বেদখল হবার পরে বার্মিজরা ১৭৮৫ সালে আরাকান দখল করে নেয়। ১৭৯৯ সালে বার্মিজদের গ্রেপ্তার এড়াতে পঁয়ত্রিশ হাজারের বেশি মানুষ সেসময় নিকটস্থ চট্টগ্রাম অঞ্চলে তাদের আদিবাস ছেড়ে স্থানান্তরিত হয়। অতঃপর বৃটিশ শাসন এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় মিত্রবাহিনীকে সমর্থনের কারণে জাপানীদের দ্বারা হাজার হাজার রোহিঙ্গা হত্যা এবং নির্যাতনের শিকার হয়। প্রাণ বাঁচাতে সেসময় বাইশ হাজার রোহিঙ্গা বাংলায় স্থানান্তরিত হয় এবং প্রায় চল্লিশ হাজার রোহিঙ্গা স্থায়ীভাবে চট্টগ্রামে বসবাস শুরু করে।

১৯৪৭ সালে ভারত-পাকিস্তান ভাগ হবার সময় তারা পাকিস্তানের সাথে থাকার ইচ্ছে পোষণ করে। এতে করে তারা নিজেদের অবস্থার উন্নতির চেয়ে অনেকটা ইচ্ছেকৃতভাবে নিজদের পায়ে কুড়াল মারে। আরাকানের অন্য জাতিগোষ্ঠীরা তা মেনে নিতে পারেনি এবং জিন্নাহও অস্বীকৃতি জানায় তাদের গ্রহণ করতে। আরাকানের অন্য গোষ্ঠীদের নিকট "বেঈমান" হিসেবে তকমা পাওয়া এবং অপরদিকে পাকিস্তানের সাথে থাকতে না পারা রোহিঙ্গারা নিজেরাই শুরু করে আরাকান স্বাধীন করার সশ্রস্ত্র সংগ্রাম।

এইটুকু গেল রোহিঙ্গাদের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি যা উইকিপিডিয়াসহ বিভিন্ন উৎস হতে জেনেছি। এবার তাদের বর্তমান অবস্থার প্রেক্ষিতে কিছুটা নিজস্ব মতামতে।

যে কোনো অঞ্চলের কোনো জাতি নির্যাতন, নিপীড়নের শিকার হলে তারা ফুঁসে উঠবেই। এটাই ইতিহাস থেকে জানা যায়। নানা সময়ে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে এমনটিই ঘটেছে। সে সকল আন্দোলন এক সময় সশ্রস্ত্র সংগ্রামেও রূপ নেয়। এটা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। রোহিঙ্গাদের ইতিহাস থেকে জানা যায়, তারা সর্বদা নিজেদের জাতিসত্ত্বাকে অক্ষুন্ন রাখতে ব্যর্থ হয়েছে। প্রতিটি পদক্ষেপেই তারা ভুল করেছে এবং চরম নির্যাতনের শিকার তারা হয়েছে। পাশাপাশি তারা সশ্রস্ত্র সংগ্রামে লিপ্ত রয়েছে। সেই যুদ্ধ তাদের নিজেদের। প্রতিবেশী দেশ হিসেবে আমাদের কিছু করণীয় নিশ্চয়ই আছে।

রোহিঙ্গাদের সশ্রস্ত্র সংগ্রামের বিরুদ্ধে মিয়ানমার সরকার অনেকটা অঘোষিত যুদ্ধই চালাচ্ছে। এতে করে চরম দূর্ভোগের শিকার হচ্ছে হাজার হাজার সাধারণ মানুষ, যা অনাকাঙ্ক্ষিত হলেও যুদ্ধের বাস্তবতা এটিই। মিয়ানমারের সেনাবাহিনী গণহত্যা চালাচ্ছে এটা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই, পাশাপাশি আরাকানের স্বাধীনতার জন্য সশ্রস্ত্র সংগ্রামে লিপ্ত গোষ্ঠীকেও পুরোপুরি নির্দোষ দাবী করা যাবে না। মিয়ানমারের সরকারী বাহিনীর উপর চালানো তাদের নানা সময়ের হামলার কারণে নির্যাতিত হচ্ছে নিরীহ সাধারণ মানুষ। প্রশ্ন হলো, আমাদের এক্ষেত্রে অবস্থান কী হওয়া উচিত। একদিকে একটি দেশে যে কোনো উগ্রগোষ্ঠী মাথাচাড়া দিয়ে উঠলে সরকার তা দমন করবে। অপরদিকে দীর্ঘসময় ধরে নির্যাতিত একটি গোষ্ঠীও নিজেদের অধিকার আদায়ের জন্য নিজেদের ভূখণ্ড দাবি করবেই। মিয়ানমার সরকার দাবি করছে উক্ত অঞ্চলে স্বাধীন আরাকান করে ইসলামীক স্টেটের আদলে একটি দেশ গঠন করার পরিকল্পনা রয়েছে রোহিঙ্গাদের। বিভিন্ন সময়ের প্রকাশিত ভিডিও এবং বার্তাগুলো দেখলে একই রকম ধারণায় জন্মায়। সেক্ষেত্রে আমরা কি আমাদের সীমানার সাথে এমন একটি অঞ্চল গড়তে দিবো কী না!

মানবতার দিক বিবেচনায়, বাংলাদেশ সরকারের নির্যাতিত সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত শতভাগ সঠিক এবং বিশ্বের অন্য অনেক দেশের কাছে তা অনুকরণীয় উদাহরণ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সম্প্রদায় প্রশংসায় পঞ্চমুখ বাংলাদেশ সরকারের। কিন্তু থেকে যায় এখানে একটি। দেশে অন্য ধর্মাবম্বীদের নির্যাতিত হবার ঘটনা কিংবা অন্য কোনো ঘটনার সাথে তুলনা করতে যাবো না। শুধু কিছু ব্যাপারে ভাবনার অবকাশ রয়েছে সেটিই বলছি। যেমন, এই রোহিঙ্গারা যারা আসছে তারা কেমন মানসিকতার। ইতিহাস বলে তারা যতক্ষণ নির্যাতিত ততক্ষণ নিরীহ। তারা কি ইসলামিক স্টেটের আদলে দেশ গড়ার আদর্শে উজ্জিবিত? তথ্য প্রমাণ কিন্তু তাই বলে। নানা সময়ে তারা আমাদের দেশের ভেতরেও বিভিন্ন রকম অপরাধে জড়িয়েছে এমন প্রমাণ পাওয়া গেছে। এখন তারা যদি সীমান্তবর্তী কোনো অঞ্চলে সিরিয়ার সীমান্তবর্তী অঞ্চলের মত ছোট ভুখণ্ড নিয়ে ইস্লামিক স্টেটের মত রাষ্ট্র ঘোষণা করার মত মানসিকতা ধারণ করে, তা কঠোর হস্তে দমন করতে হবে আমাদেরকে। আমরা মানবিকতা বিবেচনায় তাদের আশ্রয় দিতে পারি, কিন্তু আমাদের সার্বভৌমত্বের প্রতি সামান্যতম হুমকি আশা করি না।

রোহিঙ্গাদের প্রতি মানবতা প্রদর্শণের কারণে বিশ্বের নানা মহলের প্রশংসাবাণী শুনতে বেশ আরামদায়ক হলেও বাস্তবতা ততটা আরামদায়ক নয়। সবেমাত্র মধ্য আয়ের দেশে উন্নীত হওয়া একটি দেশ অনির্দিষ্ঠকাল ধরে এত বিশাল একটি জনগোষ্টী অতিরিক্ত ভার বহন করতে পারে না। তাই এই সমস্যাকে যতদ্রুত সম্ভব কূটনৈতিকভাবে সমাধানের পথে এগোতে হবে বাংলাদেশ সরকারকে। আন্তর্জাতিক মহলের উপর চাপ সৃষ্টি করতে হবে হয় তারা রোহিঙ্গাদের নিজ ভূমিতে ফিরিয়ে নেয়ার পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে, নতুবা বাংলাদেশে থাকা এই শরনার্থীদের ভাগ করে নিয়ে যেতে হবে বিভিন্ন দেশে। সিরিয়া থেকে প্রাণ ভয়ে পালিয়ে আসা শরণার্থীদের ক্ষেত্রে ইউরোপ যা করেছে তা উদাহরণ হতে পারে এক্ষেত্রে।

অনেকেই দেখছি রোহিঙ্গারা নির্যাতিত হচ্ছে তাই মিয়ানমারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার দাবি জানাচ্ছে। তাদের নিকট একটি প্রশ্ন করতে চাই, বাংলাদেশে বিশেষ করে নাসিরনগরের ঘটনা নিশ্চয়ই সকলের মনে আছে। সেসময় ভারত যদি বাংলাদেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করতো কেমন লাগতো? ৩০ মিনিট পারতাম কি ধরে রাখতে নিজ মাতৃভূমিকে? কেউ কেউ রোহিঙ্গাদের প্রতি সমবেদনা জানানোর ক্ষেত্রে বার বার তাদের ধর্ম পরিচয়কে গুরুত্ব দিচ্ছে। অথচ, হবার কথা ছিল ভিন্ন। ধর্ম পরিচয়ে নয়, মানুষ হিসেবে তাদের নির্যাতনে সমব্যথী হবার কথা ছিল আমাদের।

দেশের ভেতরে একটি অতি উৎসাহী এবং উগ্র গোষ্ঠী চেষ্টা করছে আমাদের দেশে বসবাসকারী ভিন্নধর্মাবলম্বীদের প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করার। এটা অপরাধ। আমাদের দেশের হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান কিংবা যেই ধর্মের মানুষই হোক না কেন সে একজন বাঙালি। তাকে ধর্ম পরিচয়ে নয় একজন মানুষ এবং একজন বাঙালি হিসেবেই আমাদের দেখা উচিত সবার আগে। এরপর সে যদি নিজ ধর্ম পরিচয়ে কোনো ধর্মীয় বিদ্বেষমূলক আচরণ করে তার প্রতিবাদও করতে হবে দেশে প্রচলিত আইনের মাধ্যমে।

শেষ কথা একটিই, ধর্মীয় পরিচয়ে বিদ্বেষ নয়, ধর্মীয় পরিচয়ে সহানুভূতি নয়। মানুষ হিসেবে মানুষের পাশে থাকতে হবে, নিজ দেশের সার্বভৌমত্ব অক্ষুন্ন রেখে।

[সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গঠনের লক্ষ্যে সচেতনতামূলক ক্যাম্পেইনের অংশ হিসেবে প্রকাশিত] 

https://www.facebook.com/HumaneFirst/ 

 

আরো পড়ুন 

নতুনসময়.কম এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আপনার মন্তব্য লিখুন: