৩ পৌষ ১৪২৪, সোমবার ১৮ ডিসেম্বর ২০১৭, ৩:৪০ পূর্বাহ্ণ
bangla fonts
facebook twitter google plus rss
Natun Somoy logo

দাম্পত্য জীবন বলতে শুধু সেক্স নয়


০৬ ডিসেম্বর ২০১৭ বুধবার, ০৩:২০  পিএম

শিল্পী জলি

নতুনসময়.কম


দাম্পত্য জীবন বলতে শুধু সেক্স নয়

ফরিদপুরে আমরা সারাদিন টই টই করে ঘুরতাম। সকালে একবার টহল, আরেকবার দুপুরে খাওয়ার পর। তিনটা/চারটা বাজলেই আর ঘরে পাওয়া যেত না। ফিরতাম একেবারে আজানের সময়। দিনভর টই টই করার জন্যে পায়ে-পিঠে মারও পড়তো।

সেই আমিই যখন ঢাকায় গেলাম দরকার ছাড়া ঘর থেকেও বের হই না। অফিস আর বাসা। মূল কারণ একটিই। বাইরে গেলেই বাসায় এসে গোসল করতে হয়- গায়ে চুলে ধূলাবালি জড়িয়ে মাখামাখি হয়ে থাকে, শ্যাম্পু দিয়ে গোসল না করে উপায় থাকে না।

আমেরিকায় ধূলাবালি না থাকলেও ঢাকার মতই মনোভাব রয়ে গেল। ঘরই স্বর্গ, ঘরের বাইরে কাজ ছাড়া যেতে চাই না। ওদিকে আতিকের টই টই করে না ঘুরলে আর এই দোকান সেই দোকানে না খেলে মন খট্ খট্ করে। অভিযোগ করে আমি কেন যাই না। বলি, তোমারতো খুশী হওয়া উচিত! আমি গেলেতো খরচ ডাবল হতো আবার অন্যের সাথে ট্যাঙ্কিও মারতে পারতে না সাথে থাকলে। তথাপি সেদিন যেতে হলো। অফিসের এক দম্পতির সাথে আগেই প্লান করে এসেছিল।

উইলসনভিলের ফ্যামলি ফান প্লেস, নানা রকম রাইডস আর একটিভিটিস এ ভরা। ভাবছিলাম হয়ত বয়স্ক কোন দম্পতি হবে। গিয়ে দেখলাম অনেকই ছোট। হয়ত ত্রিশ/একত্রিশ বয়স। ইতিমধ্যেই মেয়েটির চার বাচ্চা হয়ে গিয়েছে। আর আরেকটি বাচ্চা অন দা ওয়ে- ছয় মাসের গর্ভবতী। বললো, নিজেদেরওতো জীবন আছে। তাই অন্যের তদারকিতে কয়েক ঘণ্টার জন্যে বাচ্চা রেখে নিজেরা এসেছে জীবন উপভোগ করতে। বললাম, এই অবস্হায় এসব রাইডে চড়বে, ভয় করে না? বললো, সব সময়ই এমন করে তারা, কোন অসুবিধা নেই।

জনপ্রতি পঁয়ত্রিশ ডলার করে টিকিট কিনে শুরু হলো আমাদের ছুটির দিনের সারাদিনব্যাপী কার্যক্রম। প্রথমেই গলফ দিয়ে শুরু। গলফ বলতে দেশে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ গলফ খেলতেন ওটুকুই আমার জানা। লাঠি ধরে ভাবছি কী দিয়ে কী করবো? আসলেই কী পারবো? প্রতি কোর্টে মোট ছয়বারের চেষ্টায় বল গর্তে ঢুকাতে হবে। সবাই বললো খেল খেল, অসুবিধা নেই। আন্দাজেই বারি মারলাম বলে। এক বারিতেই বল প্রায় গর্তের কাছাকাছি। আর দুই বারিতে ঢুকে গেল গর্তে। নিজেরই বিশ্বাস হলো না, কী করে সম্ভব হল। ভালোই চলছিল খেলা। ওদিকে আতিকের পুরুষ কলিগটি কাগজ-কলম বের করে হিসেব রাখতে শুরু করে দিল। ফান গেইম আর ফান রইল না। আমাদের চারজনের মধ্যে প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে গিয়েছে ততক্ষণে।

একেবারে কিছুই না পারলে কোন অসুবিধা ছিল না কিন্তু মাঝে মাঝেই ভালো খেলছি বলে প্রতিযোগিতার মনোভাব চলে আসছে। ফানের বদলে বুক ধক্ ধক্ করছে, ব্লাড প্রেশার বাড়ছে। ওদিকে পঁচিশ ত্রিশটি কোর্টে গিয়ে গিয়ে খেলা। একেকটির বাঁধা একেক রকমের। সবার মাঝেই প্রতিযোগিতার মনোভাব। কয়েক কোর্টে খেলেই আমি বললাম, আমি আর খেলতে চাই না- আমার প্রেশার বেড়ে যাচ্ছে। ওরাও আর জোরাজুরি করলো না।

মেয়েটি বয়সের তুলনায় অতি ধীরস্থির এবং শান্ত। কিন্তু হিসেব করে যে একেকটি বারি মারে দেখার মত। চমৎকার খেলে সে। আতিকও ভালো খেলছে। বলতে গেলে নিশ্চিত, মেয়েটি অথবা আতিকই ফার্ষ্ট হবে। মেয়েটির সম্ভাবনাই বেশী। কখনও একবারেই সে বলটি সরাসরি গর্তে চালান করে দিচ্ছে কখনও বা দুবার বারি দিতে হচ্ছে। ওদিকে হিসেব রাখছে পুরুষ কলিগটি। খেলা দেখতে দেখতে এক সময় আমি এক বোতলের পানি ঢক ঢক করে গিলে ফেলে ঘোষণা দিয়ে দিলাম, মেয়েটিই জিতবে আজ।

খেলাশেষে আমরা গিয়ে ঢুকলাম ওখানকার একটি খাবারের দোকানে। কিছু খেয়ে তারপর অন্য খেলাগুলোয় অংশ নেবো। কলিগ পুরুষটি পয়েন্টসগুলো যোগ করতে শুরু করলো। ফলাফলে, সে প্রথম, আতিক দ্বিতীয় এবং মেয়েটি তৃতীয়। আমার বিশ্বাসই হলো না মেয়েটি এত ভালো খেলে কী করে তৃতীয় হয়। তবে, মুখে কিছুই বললাম না। আতিকেরও বিশ্বাস হয়নি। আতিক সরাসরি বললো, তোমার যোগে ভুল হয়েছে, আমি আবার গুনবো। আবার গুনলো। যোগ ঠিক আছে। তবুও আমার ঠিক বিশ্বাস হলো না সারাক্ষণ খারাপ খেলে ছেলেটি কী করে প্রথম হয় আর যেখানে মেয়েটির প্রথম হবার কথা সে একেবারে তৃতীয় স্হান। হিসেব রাখার সময় বিষয়টিতে আমরা কেউ মনোযোগ দেইনি। মনেই হয়নি এই বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ স্বচ্ছতার জন্যে।

খাওয়া শেষে গেলাম গোলাগুলি খেলায়। অন্ধকার ঘরে বাইকে চড়ে। সিটবেল্ট বেঁধে চেয়ারের মত সিটে বসতে হবে পিস্তল হাতে নিয়ে। আর সামনের স্ক্রীনে নানাদিক দিয়ে নানাভাবে শত্রু উঁকি মারবে হানা দিতে। দেখতেই গুলি ছুড়তে হবে। যে যত বেশী গুলি ছুড়ে শত্রু ঘায়েল করতে পারবে সেই তত বেশী পয়েন্টস পাবে। ওদিকে বাইরে দাঁড়ানো আত্মীয়স্বজন টিভি পর্দায় দেখতে পাবে তাদের আপনজনটি কেমন খেলছে অন্যদের তুলনায়। মেয়েটি আর আমি খেলছি ভেতরে অন্য ছয়জন নারীপুরুষ এবং শিশুদের সাথে। আতিক আর তার কলিগ বাইরে দাঁড়িয়ে দেখছে সেই খেলা। খেলা শুরু হতেই সিট উল্টাপাল্টা নড়তে শুরু করলো। যেনো মটরবাইক চলছে পাহাড়পর্বত আর ভাঙা রাস্তার উপর দিয়ে।

বলতে গেলে ঠিকমত বসে থাকাই দায়। ওদিকে আবার হাতে আমাদের পিস্তল, চোখে সানগ্লাসেস আর ঘরটি ঘুটঘুটে অন্ধকার। তারই মাঝে শত্রু দেখতেই গুলি ছুড়তে থাকলাম। অনেকগুলো শত্রুও মরলো। খেলা শেষে যখন বের হলাম তখন দেখলাম আট জনের মধ্যে আমার পজিশন সপ্তম। একেবারে ছবিসহ ফলাফল টিভি স্ক্রীনে। আতিক হাসছে। মেয়েটি দ্বিতীয় হয়েছে। আতিককে বললাম, তোমার আবার লজ্জা লাগছে নাতো? বলে, লজ্জা কেন লাগবে, আমি যখন পঞ্চম হয়েছি সে তখন সপ্তম হয়েছে! মেয়েটিকে বললাম, তুমিতো খুব ভালো খেললে! বলে, এসব আমি সব সময়ই খুব ভালো খেলি।

গোলাগুলি শেষে গেলাম বোট রাইডে। সবার একটি করে বোট। বোটে দুটি করে বাটন/বোতাম। একটি টিপলে বোট চলাচল করে আর আরেকটি টিপলে পানির গুলি ছোড়ে টার্গেটের উপরে। সুইমিং পুলের মত বড় একটি পুল তাতেই বিশ/পঁচিশটি বোট। নানা বয়সের সওয়ারী চড়বে একেকটি বোটে আর পানির গুলি ছুড়বে একজনকে লক্ষ্য করে। বোটে চড়ে ভাবছিলাম, বাচ্চা বাদ রেখে অন্যদের ভেজাবো যদি তারা আমাকে ভেজায়, নইলে কাউকেই ভেজাবো না। বোট ছাড়তেই এক বাচ্চা টার্গেট করে আমাকে ভেজাতে শুরু করে দিল। আমি ভিজি আর খিল খিল করে হেসে মাথা সরাতে থাকি। কিন্তু পথ নেই পালাবার।

ওদিকে হাসির কারণে দাঁতের ফাঁক দিয়ে মুখে নোনা পানি ঢুকে যাচ্ছে কিন্তু ভদ্রতা রাখতে থু থু ফেলা যাচ্ছে না। ভাবছি অন্যরা তাদের থুথু কী করছে? তাদের কী থুথু হচ্ছে না? যদি রহস্যটি জানা যেতো। এক সময় ভিজতে ভিজতে আমিও এগার/বার বছরের বাচ্চা মেয়েটিকে ভেজাতে শুরু করলাম। সাথে সাথেই তার বান্ধবী বলে উঠলো, তোমার এত বড় স্পর্ধা, আমার বান্ধবীকে ভেজাও, এবার ভেজো। তারা দু`জন মিলে আমাকে একযোগে ভেজাতে শুরু করলো।

হাসি ডাবল, মুখেও ডাবল নোনা পানির প্রবেশ, ডাবল থুথুর চাপ। খেলা শেষে ভেজা কাক হয়ে উঠে এলাম ডাঙায়। ছবিও তুললাম। একটি ভুরুর আঁকা কালি সম্পূর্ণ ধুয়ে গিয়ে অরিজিনাল বের হয়ে গিয়েছে, আর অন্যটি তখনও অক্ষত, যেনো তুলনামূলক আলোচনার রাজসাক্ষ্মী হয়ে কাজ করতে চায়।

ঐ অবস্হাতেই আতিক আমি তার বেয়ে সটাং উপরে ওঠার রাইডে চড়ে সটাং নেমেও এলাম বাজপাখির পিঠে চড়ে। টুকটাক রকমারি রঙঢঙের খেলা শেষে যোগ দিলাম কার রেসে। সত্যিই রেসের মত কার আবার চলেও আঁকাবাঁকা আলুথালু পথে। কন্ট্রোল রাখাও সহজ নয়। টিভি পর্দায় ধারা বর্ণনাও চলে দেখিয়ে দেখিয়ে। আমি মূলত কন্ট্রোল রাখতেই মনোযোগী ছিলাম। তবে তরুণরা কন্ট্রোলের চেয়ে প্রতিযোগিতাতেই বেশী ধ্যান দিল।

মেয়েটির মাধ্যমে জানলাম আমেরিকানরা বাচ্চাদের পাশাপাশি নিজেদের দাম্পত্য সম্পর্কটিকেও নিয়মিত তদারক করে সতেজ এবং চলমান রাখতে। যেনো সংসারের চাপে স্বামীস্ত্রী`র বন্ধনের মাঝে দূরুত্ব তৈরী হয়ে না যায়। যেনো দাম্পত্য জীবন বলতে শুধুমাত্র সেক্স নয়, যৌথ সময় অতিবাহিত করা, শেয়ারিং, পারস্পরিক শ্রদ্ধা, নির্ভরতা এবং পরস্পরের সঙ্গ উপভোগও আজীবন অব্যহত থাকে। সর্বোপরি, যৌথ জীবনে কোন সঙ্গী যেনো একা না হয়ে যায়।

লেখক : মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী সমাজকর্মী

নতুনসময়.কম এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আপনার মন্তব্য লিখুন: