৭ আষাঢ় ১৪২৫, বৃহস্পতিবার ২১ জুন ২০১৮, ১১:৫৬ অপরাহ্ণ
bangla fonts
facebook twitter google plus rss
Natun Somoy logo

ঢাকা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির বিরুদ্বে জমি দখলের অভিযোগ


০৮ মার্চ ২০১৮ বৃহস্পতিবার, ০২:০১  পিএম

সাভার করেসপন্ডেন্ট

নতুনসময়.কম


ঢাকা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির বিরুদ্বে জমি দখলের অভিযোগ

রাজধানীর উপকন্ঠ আশুলিয়ার থানার নয়ারহাট বাজারে ঢাকা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির বিরুদ্ধে ভুয়া দলিল দিয়ে একটি নিরীহ পরিবারের জমি দখলের অভিযোগ পাওয়া গেছে। আর এই অপকর্মে সাভার সেটেলমেন্ট অফিসের কিছু দুর্নীতিবাজ সরকারী অফিসার এবং স্থানীয় প্রভাবশালী একটি জালিয়াত চক্রের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগও এসেছে এই প্রতিবেদকের কাছে।

সরেজমিন তদন্ত করে জানা গেছে,ঢাকা জেলার সাভার উপজেলার আশুলিয়া থানা এলাকার বংশী নদীর পাশে ধনিয়া মৌজায় নয়ারহাট বাজারের সরকারি প্রাইমারী স্কুলের উত্তর পাশে ধনিয়া গ্রামের শ্রী নিবারন চন্দ্র সরকারের ছেলে গঙ্গাচরন সরকার এবং মেয়ে রেনুবালা সরকারের কাছে থেকে ১৯৬৯ সালের ২৮ মে সাভার সাব-রেজিষ্ট্রার অফিসে রেজিষ্ট্রিকৃত ৪৪৩০ নং সাফ কবলা দলিল দ্বারা সিএস-২৯ নং, এসএ-৩১ নং, আরএস-২৬ নং খতিয়ানের সিএস ও এসএ-১২৪ নং দাগের আরএস-৭২ নং দাগে মোট ৮৪ শতাংশ জমি ক্রয় করেন রাজধানীর কাঠালবাগানের সামসুন নাহার।

সামসুন নাহার বিগত ১৯৭৩ সালের ২০ শে অক্টোবর সাভার সাব-রেজিষ্ট্রার অফিসে রেজিষ্ট্রিকৃত ৮৮৬৮ নং সাফ কবলা দলিল দ্বারা পাশ্ববর্তী রহিমপুর গ্রামের হাজী আফসার উদ্দিনের কাছে ৭২ শতাংশ সম্পত্তি বিক্রয় করেন।

হাজী আফছার উদ্দিন জমি ভোগ দখল করাবস্থায় ২০০৫ সালে মারা যান। তিনি তার চার পুত্র- আবু সাইদ আহাম্মেদ, মোঃ আবু তাহের,মোঃ কবির হোসেন,মোঃ শরিফুল ইসলাম রতন ও চার কন্যা-

মোসাঃ সাহেলা,সুলতানা আহাম্মেদ, মোসাঃ কানিজ ফাতেমা, মোসাঃ লুৎফুন নাহার এবং বিবাহিত দুই স্ত্রী - সাহেদা বেগম এবং বায়লা খাতুনকে রেখে মারা যান। তারা ৭.৯০ শতাংশ নিজেদের নামে রেখে বাকি জমি থেকে ২৫ শতাংশ প্রাইমারি স্কুলের নামে দানপত্র করেন। বাকি অংশগুলো বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন লোকের কাছে বিক্রি করেন। উক্ত জমির পূর্ব পাশে মরহুম মোখলেসুর রহমান খানের ছেলে হাফিজুর রহমান খানের চার তলা বাসায় ২০১৪ সালে আগস্ট মাসের ১ তারিখে মাসিক ৪১,০৪০ টাকা ভাড়ায় তিন বছরের চুক্তিতে ভাড়া নেন ঢাকা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি। ভাড়াটিয়া দলিলে ঢাকা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি- ৩ এর পক্ষে সাক্ষ্বর করেন তৎকালীন জেনারেল ম্যানেজার সৈয়দ ওয়াহিদুল ইসলাম। কিন্তু ভাড়া বাসাটা নয়ারহাট সাব-জোনাল অফিস হিসেবে ব্যাবহার করার নামে ঢাকা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির কিছু দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা ২০১৭ সালে মরহুম হাজী আফসার উদ্দিনের পরিবারের মালিকানাধীন পাশের ৭.৯০ শতাংশ খালি প্লট রাতের আধারে বেদখল করে। রাতের আধারে সন্ত্রাসী বাহিনী নিয়ে খালী সেই প্লটে বৈদ্যতিক তাড় দিয়ে বেড়া এবং একটি আধাপাকা ঘরও নির্মাণ করেন। বেদখল পাকাপুক্ত করতে প্লটে কিছু নস্ট বৈদ্যতিক কুটি ফেলে রাখে। এই বেদখলের প্রতিবাদ করার চেস্টা করলে জালিয়াত চক্র মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানীর ভয় দেখায় মরহুম হাজী আফসার উদ্দিনের সন্তানদের। এই জমি দখলে এলাকার এক ভুমি জালিয়াত চক্রও ঢাকা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিকে সাহায্য করে উক্ত জায়গাটি পানির দামে কিনতে না পারার প্রতিশোধ হিসাবে।

সাভার সেটেলমেন্ট অফিসের দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের মোটা টাকা ঘুষ দিয়ে ঢাকা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির কিছু কর্মকর্তা সমিতির নামে বিএস মাঠ পর্যায়ের জরিপ করে খুব গোপনীয়তা রক্ষা করে। পরে জমির মালিকরা জানতে পেরে ১৯৫৫ সালের প্রজাস্বত্ব বিধিমালার ৩০ বিধিতে আপত্তি কেস দায়ের করে সাভার সেটেলমেন্ট অফিসে। সহকারী সেটেলমেন্ট অফিসার মজিবুর রহমান আপত্তি অফিসার নিয়োগ হন। তিনিও আরেক ধাপ জালিয়াতির আশ্রয় নিয়ে দুইটি ভুয়া দলিলের ভিত্তিতে ঢাকা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির পক্ষে বিএস মাঠ পর্যায়ের জরিপ বহাল রাখেন।

আপত্তি নিষ্পত্তির মামলা সাভার সেটেলমেন্ট অফিসে শুনানি চলাকালীন সময়ে স্টার লিংক লন্ড্রি লিমিটেডের দুইটি দান পত্রের উল্লেখ করে ঢাকা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির । গত ২৬/০৫/২০১৫ ইং তারিখের রেজিষ্ট্রিকৃত ৭০৪০ নং এবং গত ০২/০৯/২০১৫ ইং তারিখের রেজিষ্ট্রিকৃত ১১৭২১ নং দলিল দাখিল করে মিথ্যা রেকর্ড প্রাপ্ত হয়। অথচ ঢাকা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির উক্ত দাখিলকৃত দলিল ২টির তফসিল অংশের আর.এস-১৭০ ও ১৭২ নং দাগ উল্লেখ আছে। উল্লেখিত দাগের জমিটি বন্ধ হয়ে যাওয়া কোহিনূর ক্যামিক্যালের নিকট এবং সেখানে ঢাকা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির অন্য একটি স্থাপনাও আছে। এভাবে এক দাগের দলিল দেখিয়ে আরেক দাগের মালিকানা দাবি করে এবং জমিটি বেদখল করে রাখে।

আর এই ভুয়া এবং বানোয়াট দলিলের কথা জেনেও সহকারী সেটেলমেন্ট ও আপত্তি অফিসার মোঃ মজিবুর রহমান গত ০৯/০৮/২০১৭ ঢাকা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির পক্ষেই বিএস রেকর্ড বহাল রাখেন। ফলে মরহুম হাজী আফসার উদ্দিনের পরিবারের পক্ষে সাভার সেটেলমেন্ট অফিসে ৩১ ধারায় উক্ত রেকর্ড এর বিরুদ্ধে আপিল মোকদ্দমা নং-৮০/১৮, তারিখ ১৮/০১/২০১৮ ইং দায়ের করেন। অত্র আপিল মোকদ্দমার অফিসার নিযুক্ত হন সহকারী সেটেলমেন্ট ও আপিল অফিসার জনাব মোঃ আতাউর রহমান।

আপিল শুনানি চলাকালে সবাইকে অবাক করে দিয়ে ঢাকা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির কর্মকর্তারা অফিসিয়াল প্যাডে চিঠি দিয়ে উক্ত ৭০৪০ ও ১১৭২১ নং দলিল তাদের দেয়া না বলে দাবি করেছে। অথচ অন্য দাগের এই দুইটি দানপত্র দেখিয়ে তারা বেদখল করা এই জমির মালিকানা দাবি করেছিল। এই দুটি ভুয়া দলিলের ভিত্তিতে সহকারী সেটেলমেন্ট অফিসার মজিবুর রহমান আরেক ধাপ জালিয়াতির আশ্রয় নিয়ে ঢাকা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির পক্ষে বিএস মাঠ পর্যায়ের জরিপ বহাল রাখেন।

ঢাকা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির পক্ষে গত ১৯/০২/২০১৮ ইং তারিখে স্মারক নং-৮৯৫ এ লিখিত বর্ণনায় উল্লেখ করেন যে, আর.এস-৭২ নং,খতিয়ানের নম্বর-১৪৫৬, জেএল নম্বর-৫২ এর মধ্যে ৭.৯০ শতাংশ সম্পত্তি অধিগ্রহণকৃত এবং যাহা ঢাকা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির পক্ষে পাওয়ার জন্য পত্র প্রেরণ করিয়াছে এবং বাকী কার্যক্রম প্রক্রিয়াধীন বলে উল্লেখ করিয়াছে।

তাদের দাবির পক্ষে কোন ধরনের কাগজপত্র না দেখাতে পারলেও সহকারী সেটেলমেন্ট ও আপীল অফিসার মোঃ আতাউর রহমান ঢাকা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির নামে মাঠ পর্যায়ের বিএস জরিপ বাতিল করে ৭.৯০ শতাংশ জমি জেলা প্রসাশকের নামে রেকর্ড করার রায় প্রদান করেন। অথচ উক্ত নালিশী সম্পত্তি ছাড়া উক্ত আরএস ৭২ দাগের সব জমিই ব্যাক্তিমালিকানা হিসাবে তাদের নামেই বিএস মাঠ পর্যায়ের রেকর্ড সমপন্ন হয়েছে। ঢাকা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির নয়ারহাটের কথিত সাব জোনাল অফিসের ভাড়া বাসাটিও আরএস ৭২ দাগের এবং সেটিও ব্যাক্তিমালিকানা হিসাবে জমির মালিক হাফিজুর রহমান খানের নামেই বিএস মাঠ পর্যায়ের রেকর্ড সমপন্ন হয়েছে।

এই বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে সহকারী সেটেলমেন্ট ও আপত্তি অফিসার মোঃ মজিবুর রহমান বলেন,"আমি একটা ভুল করে ফেলেছি। কিন্তু ভুলটাতো আমি একাই করিনি। আমার কাছে ৩০ ধারায় আপত্তি আসার আগেই তো সারভেয়ার উক্ত ৭.৯০ শতাংশ নালিশী সম্পত্তি ঢাকা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির নামে রেকর্ড করে ফেলে।"

আপিল রায়ের বিষয়ে সহকারী সেটেলমেন্ট ও আপীল অফিসার মোঃ আতাউর রহমানকে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন,"আমি তো আর আগের অফিসারের মতো ঢাকা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির পক্ষে রায় দেয় নাই।"

কোন কাগজের ভিত্তিতে ব্যাক্তি মালিকানাধীন জমি জেলা প্রশাসকের নামে রেকর্ড করার রায় দিলেন জিজ্ঞেস করলে আমতা আমতা করে তিনি বলেন," অধিগ্রহণের পক্ষে কোন সার্টিফাইড দলিল ছাড়া আমার মনে হয় এই রায় আমার দেয়া ঠিক হয়নি।"

তিনি মরহুম আফাজ উদ্দিনের পরিবারকে আপিলের রায়ের বিপক্ষে রিভিওর আবেদন এবং প্রয়োজনে ভূমি আপিল আদালতে মামলা দায়ের করার উপদেশ দেন।

উক্ত অভিযোগসমুহ লিখিতভাবে ভুমি মন্ত্রানালয়,ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তরের এবং জোনাল সেটেলমেন্ট অফিসেজানিয়ে প্রতিকার চাওয়ার প্রস্ততি নিচ্ছে মরহুম আফাজ উদ্দিনের পরিবারের সন্তানেরা।

ঢাকা জোনাল সেটেলমেন্ট অফিসার এবং যুগ্মসচিব মোঃ আনিসুজ্জামান এই বিষয়ে বলেন," এই সংক্রান্ত অভিযোগ পেলে তদন্ত করে দেখবো। অভিযোগের প্রমান পেলে দায়ী ব্যাক্তিদের বিরুদ্বে কঠোর শাস্তিমুলক ব্যাবস্থা নেয়ার আশ্বাস দেন এই প্রশাসনের সিনিয়র অফিসার।

আইএ

নতুনসময়.কম এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আপনার মন্তব্য লিখুন: