৬ শ্রাবণ ১৪২৫, শনিবার ২১ জুলাই ২০১৮, ১:৩৮ অপরাহ্ণ
bangla fonts
facebook twitter google plus rss
Natun Somoy logo

‘ঘুষ নেবেন ঘুষ, হরেক রকম ঘুষ আছে...’


০৬ জানুয়ারি ২০১৮ শনিবার, ০৬:০৯  পিএম

জোবাইদা নাসরীন

নতুনসময়.কম


‘ঘুষ নেবেন ঘুষ, হরেক রকম ঘুষ আছে...’

এই লেখাটির শিরোনাম বাংলাদেশের খ্যাতিমান কবি হেলাল হাফিজের কবিতা ‘ফেরীঅলা’ থেকে নেওয়া। কবিতাটির প্রথম স্তবকে বলা হয়েছে:
কষ্ট নেবে কষ্ট
হরেক রকম কষ্ট আছে
কষ্ট নেবে কষ্ট!

লাল কষ্ট নীল কষ্ট কাঁচা হলুদ রঙের কষ্ট
পাথর চাপা সবুজ ঘাসের সাদা কষ্ট,
আলোর মাঝে কালোর কষ্ট
‘মালটি-কালার’কষ্ট আছে
কষ্ট নেবে কষ্ট।

এই নিবন্ধের শিরোনাটি হেলাল হাফিজের ‘ফেরীঅলা’ কবিতার ‘কষ্ট নেবে কষ্ট/হরেক রকম কষ্ট আছে’ পঙ্ক্তি দু’টির প্যারেডি। কারণ ঘুষ বিষয়টিরও হরেক রকম ঢঙ আছে। আছে এর নানা ধরনের ফেরিওয়ালা ও গ্রহীতা। একেক রকম ঘুষে একেক জন খুশি। সবাইকে এক ধরনের ঘুষ দেওয়া যায় না, সবাই একই ধরনের ঘুষও চান না হয়তো। বাংলাদেশে উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তাদের ফাইল আটকে রাখা, ‘উপরি’ নেওয়া কিংবা ‘উপহার দেওয়া’ নিম্নপদে কর্মচারীদের চা-নাস্তা খাওয়া, ‘খুশি মনে যা দেন’ টাইপের ঘুষের সঙ্গে আমরা কম-বেশি সবাই পরিচিত। কিন্তু এর বাইরে যে ধরনের ঘুষের চর্চা সবচেয়ে বেশি হয়, তা হলো পুরোমাত্রায় আনুগত্য আর তোষামোদী। বর্তমানে দেশে এই ঘুষটিও অন্যান্য ঘুষের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলছে সমান তালে।

কয়েকদিন ধরেই এই ঘুষ নিয়ে আলোচনা, হাসাহাসি আর বাহাস বাড়ছে। এর সঙ্গে তর্কে-বিতর্কে উঠে এসেছে এর ‘সহনশীল’ আর মন খারাপ করা মেজাজের বিষয়ও। এতদিন ঢিলেঢালাভাবে, গোপনে কিন্তু মানুষের মুখে হর হামেশাই উচ্চারিত হওয়া ‘ঘুষ’ বিষয়টি আবারও রাষ্ট্রীয় জীবন পেলো স্বয়ং শিক্ষামন্ত্রীর বক্তব্যে। ২০১৪ সালের পর আবারও মন্ত্রীদের মুখে শোনা গেলো ‘সহনীয়’ মাত্রায় ঘুষের বৈধতা। পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদফতরের (ডিআইএ) কর্মকর্তাদের উদ্দেশে গত বছরের ৪ ডিসেম্বর শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ ‘সহনশীল ঘুষ’-এর আনুষ্ঠানিক আসকারা দেন। তবে এই সংস্কৃতি বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে চর্চিত, তবে তা রাষ্ট্র পর্যায়ে এতটা স্বীকৃতি পায়নি। বরং ক্ষীণ ছিল। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ দেশের সাতটি খাতের দুর্নীতির বিষয় নিয়ে প্রতিবেদন হাজির করলেও দুর্নীতির পরিমাণ বিবেচনায় শিক্ষাখাতের দুর্নীতি লাগামছাড়া বলে তাদের বিভিন্ন জরিপে তুলে ধরেছে। শিক্ষার বিভিন্ন বিভাগ ধরে ধরে যখন তারা গবেষণা হাজির করছে, তখন একইসঙ্গে মন্ত্রণালয় থেকে চলছে এসব জরিপকে ‘একেবারেই গ্রহণযোগ্য’ নয় বলে অস্বীকারের প্রবণতা।

তবে ঘুষ বিষয়ে কারও কারও অবস্থান যৌতুক চাওয়ার মতো। যৌতুক চাওয়ার মতো সরাসরি বলে দেয় যে, ঘুষ না দিলে চাকরি বা কোনও কাজ হবে না। অনেকের থেকেই শোনা যায় টাকা বা উপহার নিয়ে ঘুরছেন কিন্তু কিভাবে দেবেন, কোথায় দেবেন, বুঝতে পারছেন না। সেটি দেওয়ারও বিশেষ নিয়ম আছে কোনও কোনও জায়গায়। শিক্ষামন্ত্রী সহনশীল ঘুষের কথা বলেননি বলে প্রথমে সংবাদের প্রতিবাদ ও পরে সংবাদ সম্মেলন করে ব্যাখ্যা দিয়েছেন। এবার আগের মতোই সাংবাদিকদের সংবাদ পরিবেশনের ত্রুটি নিয়ে কথা বলেছেন। এটিও কেন যেন একধরনের চর্চায় পরিণত হয়েছে। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন মন্ত্রীর ‘বেফাঁস’ কথাবার্তায় যখন পাবলিক নড়াচড়া শুরু হয়, তখনই তারা স্বর পাল্টান এবং এটিকে বোঝাপড়ার সমস্যা হিসেবে হাজির করেন। এটিও এই প্রথম নয়, বিভিন্ন সময়ই এমনটি হয়েছে। তাহলে বোঝা যাচ্ছে মন্ত্রীদের একজন ‘তর্জমাকারি’দরকার, যিনি বিভিন্ন বক্তেব্যর তর্জমা করে দেবেন এবং রাষ্ট্রীয় ‘ভুল বোঝাবুঝির’ অবকাশ থাকবে না।

শিক্ষামন্ত্রীর এই বক্তব্য শিক্ষা ব্যবস্থাপনার একটা চিত্র সামনে এসেছে। এর খণ্ডখণ্ড চিত্র আমরা দেখছি প্রায় প্রতিদিনই। চলছে প্রাথমিক শিক্ষকদের আন্দোলন। প্রতিদিনও পাল্লা দিয়ে চলছে প্রশ্নপত্র ফাঁসের রিলে রেস। কিভাবে আগের পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের সময়ের রেকর্ড ভাঙা যায়। শিক্ষামন্ত্রী নিজেও বলেছেন, ‘১৯৬১ সাল থেকেই প্রশ্নপত্র ফাঁস হচ্ছে। তবে এখন দেশ এগিয়েছে বলে প্রশ্ন ফাঁস হয় পরীক্ষার দিন, পরীক্ষা শুরু হওয়ার দু-চার ঘণ্টা আগে। এখন ছয় বছর বয়সী শিশুরাও জানে তাদের পরীক্ষা প্রশ্ন ফাঁস হবে, টাকা থাকলে পরীক্ষার আগেই প্রশ্ন কিনতে পাওয়া যায়’। পত্রিকার রিপোর্ট থেকে জানা যায় দেশের প্রাথমিক স্কুলগুলোতেও এবার প্রশ্ন ফাঁসের হিড়িক দেখা গেছে। প্রশ্ন ফাঁস প্রমাণিত হওয়ায় বরগুনায় ৩৯৫, মুন্সীগঞ্জে ১১৩ ও নাটোরে ১০২টি অর্থাৎ মোট ৬১০টি স্কুলের বার্ষিক পরীক্ষা স্থগিতও করা হয়েছে।

ঘুষ হাঁটাহাঁটি করছে শিক্ষার সব স্তরেই। এক্ষেত্রে পিছিয়ে নেই পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও– ‘সুশাসনের চ্যালেঞ্জ ও উত্তরণের উপায়’শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে প্রভাষক নিয়োগের প্রতিটি ধাপেই দুর্নীতি হচ্ছে। এক্ষেত্রে সর্বনিম্ন ৩ লাখ থেকে সর্বোচ্চ ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ লেনদেন হয় কোনও কোনও পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে। তবে জরিপ কিংবা শিক্ষাবিদদের পর্যবেক্ষণ যাই বলুক না কেন, মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বার বারই এসব অভিযোগ অস্বীকার করা হয়। তবে স্বীকার করেছেন মাত্র একজন।

অর্থনৈতিক লেনদেন, রাজনৈতিক ও ব্যক্তিক আনুগত্য এবং তোষামোদীদের ঘুষের কারণে বছরের পর বছর ধরে একই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে থাকছেন শিক্ষকরা। এর মূল কারণ হলো কোচিং-বাণিজ্যের মাধ্যমে অর্থ উপার্জন। রাজধানীর আটটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ৯৭ জন শিক্ষকের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সম্প্রতি সুপারিশ করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন। গত বছরের নভেম্বর মাসের শুরুতে ২৪টি সরকারি বিদ্যালয়ের ৫২২ জন শিক্ষককে একই কারণে বদলির সুপারিশ করে দুদক। তবে শিক্ষা মন্ত্রণালয় এই বিষয় নিয়ে এখনও কোনও ধরনের ব্যবস্থা নেননি।

তবে ঘুষের বৈধতা প্রথম আসে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত ২০১৪ সালের এক বক্তব্যে। তিনি বলেছিলেন, ‘ঘুষ হলো স্পিড মানি, তাই এটি দেওয়া অবৈধ নয়।’ তখন তিনি বলেছিলেন, ‘‘রিকশায় চড়ে টাকা দেওয়াটা বৈধ এবং কারও কাজ দ্রুত করে দিয়ে, উপহার নিলে সেটা অবৈধ মনে করা হয়। কিন্তু আমি মনে করি, কাজ দ্রুত করায় যদি কেউ কাউকে উপহার হিসেবে কিছু দেয়, তবে তা অবৈধ নয়। উন্নত দেশে এটার বৈধতা দেওয়া হয়েছে ভিন্ন নামে। তারা এটার নাম দিয়েছে ‘স্পিড মানি’।’’

তবে দেশের আইনের সংজ্ঞা মন্ত্রীদের এই সব বক্তব্যকে খারিজ করে। দেশের আইনে ঘুষ দেওয়া-নেওয়া দুটোকেই দুর্নীতি হিসেবে সংজ্ঞায়িত করে এগুলোকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ বলে ক্রিমিনাল প্রসিডিওর কোডে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তাহলে `স্পিড মানি` কিংবা ‘সহনীয়’ ঘুষের উৎসাহ একদিকে যেমন ক্রিমিনাল প্রসিডিওর কোর্টে অন্তর্ভুক্তিকরণকে অবজ্ঞা করা হয়, অন্যদিকে এই ধরনের চর্চার চলমানতার বাইরেও ‘আরও জোর কদমে’ এগিয়ে যাওয়ার প্রতি ইঙ্গিত করে। রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে যখন ঘুষের স্বীকৃতিও হলো, তখন ঘুষের ফেরিওয়ালাদের আর দেরি কেন? পসরা সাজান আরও নানা রকম ঘুষ নিয়ে। আর গ্রহীতারা তো প্রস্তুতই আছেন।

লেখক: শিক্ষক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
ইমেইল: zobaidanasreen@gmail.com

সূত্র: বাংলা ট্রিবিউন

নতুনসময়.কম এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আপনার মন্তব্য লিখুন: