৭ আষাঢ় ১৪২৫, বৃহস্পতিবার ২১ জুন ২০১৮, ৪:২৭ অপরাহ্ণ
bangla fonts
facebook twitter google plus rss
Natun Somoy logo

গাভীন কাণ্ড


০৩ এপ্রিল ২০১৮ মঙ্গলবার, ০২:২২  পিএম

ডা. মঞ্জুর মোর্শেদ

নতুনসময়.কম


গাভীন কাণ্ড

- সমস্যাটা একটু এটিপিক্যাল, বুঝলে? স্ত্রী কর্তৃক স্বামীকে নির্যাতনের কেস। লোকটাকে তোমার কাছে একটু পাঠালাম।

- স্যার, এই ক্রিটিক্যাল ব্যাপারগুলো শুধু আমার কাছেই কেন পাঠান স্যার? এসব মিটমাট করতে একদম জান বের হয়ে যায় স্যার।
এস পি স্যার একটু হেসে বললেন

- দ্যাখো, ভদ্রলোক বেশ উচ্চপদস্থ চাকরিজীবী। যার তার কাছে উনি ব্যাপারটা খুলে বলবেন না। মোর ওভার, তোমার ব্যাকগ্রাউন্ড ডাক্তারি হওয়াতে তুমি হয়ত বুঝতে পারবে মহিলার কোনো মানসিক সমস্যা আছে কিনা।
হতাশা চেপে রেখে স্যারকে বললাম

- ঠিক আছে স্যার। ভদ্রলোককে পাঠিয়ে দিন। আর স্যার, আমার সঙ্গে ইন্সপেক্টর ফজলুকে রাখলাম। দুজন মিলে উনার প্রবলেমটা শুনে দেখি কী করা যায়।
আট মাস হলো উজিরগঞ্জ জেলায় এসেছি। ফ্যামেলি এখনো নিয়ে আসতে পারিনি। একা একা সময় কাটে না, তাই যতক্ষণ পারি কাজে ব্যস্ত থাকি। আর স্যারও কেন যেন এসব আজেবাজে প্রবলেমগুলো আমাকে ধরিয়ে দেন। নাও করতে পারি না স্যারকে। যতসব!

ও! ইন্সপেক্টর ফজলু কে, তা জানতে চাচ্ছেন? ভদ্রলোকও এখানে নতুন পোস্টিং নিয়ে এসেছেন। উনার ফ্যামেলিও ঢাকায়। দারুন স্মার্ট আর বুদ্ধিমান। আমাদের কাছে আসা বেশিরভাগ কেস্ আমরা দুজনে মিলেই দেখি।

যাই হোক, স্যারের পাঠানো ‘স্ত্রী কর্তৃক নির্যাতিত’ ঐ ভদ্রলোক আসলেন। স্যুট পরা আলিশান গাড়ি থেকে নেমে আসা ভদ্রলোককে দেখে কে বলবে যে উনি ডেইলি বউয়ের খুন্তির বাড়ি খান!

আমি আর ফজলু মন দিয়ে ভদ্রলোকের ‘যাঁতাকল’ কাহিনী শুনলাম। বড়লোকের মেয়েকে বিয়ে-টাকার যোগান দিতে দিতে নাভিশ্বাস-ভদ্রলোকের আত্মীয়-স্বজনের প্রতি দুর্ব্যবহার-গোয়েন্দাগিরি-সন্দেহ-পান থেকে চুন খসলে কিল ঘুষি প্রহার- মানে যাকে বলে ভয়াবহ কাহিনী। সব শুনে আমি ঝিম মেরে গেলাম। কী সমাধান করবো এর? হঠাৎ ইন্সপেক্টর ফজলু লোকটিকে বললেন
- আপনার স্ত্রীর বাড়ি কি রসুলপুর জেলার হাতিপতি থানায়?
- জ্বী, জ্বী! কিভাবে বললেন বলেনতো? আমিতো একবারও ওর বাড়ি কোথায় তা আপনাকে বলিনি?

ভদ্রলোক অবাক চোখে তাকিয়ে বললেন। বুঝলাম, তিনি বেশ ইমপ্রেসড্!
- কিভাবে জানলাম তা আপনার জেনে কাজ নেই। আপনি আজকে আসেন। আমি স্যারের সঙ্গে পরামর্শ করে দেখি কিভাবে আপনার প্রবলেমটা সলভ্ করা যায়।
ভদ্রলোক চলে গেলে এবার আমিই ফজলুকে চেপে ধরলাম
- ফজলু সাহেব, কিভাবে লোকটার বউয়ের বাড়ির ঠিকানাটা বললেন, বলেনতো? এটাতো পুরো ম্যাজিকের মতো লাগলো! নাকি মহিলাটাকে আগে থেকে চেনেন?

- না না স্যার। মহিলাটাকে চেনার প্রশ্নই ওঠে না। তবে কিভাবে এটা বুঝতে পারলাম, তা আপনাকে বলি। একটা গল্প তাহলে শোনেন স্যার।

ইন্সপেক্টর ফজলু তার গল্প শুরু করলেন, ‘ছোট্ট একটা গ্রামে ছিল একটাই মাত্র গরু। ওই গরুর দেয়া দুধ খেয়েই গ্রামের লোকজনের দিন চলত। কিন্তু গরুটা একদিন কোনো কারণে হঠাৎ দুধ দেয়া বন্ধ করে দিল। লোকজন নানা ধরনের চেষ্টা তদবির করল, কিন্তু গরুর ওলানে আর দুধ আসে না। বিরক্ত হয়ে গ্রামবাসী ঠিক করল বিরামপুর গ্রাম থেকে তারা একটা গাভী নিয়ে আসবে।

সে মোতাবেক তারা একদিন সেই গ্রাম থেকে একটা ভালো দেখে স্বাস্থ্যবতী গাভী কিনে নিয়ে আসল। আর কী আশ্চর্য, সেটা যেন সেই রূপকথার কামধেনু! দিনে দুবার করে তার ওলান ভরে দুধ আসতে লাগল। সারা গ্রামের লোক পেট ভরে সেই দুধের নহর পান করে গাভীটাকে বাহবা দিতে থাকল।

কিছুদিন পর গ্রামের লোকজন ভেবে দেখলো
-আহা! এ রকম গাভীন যদি আমাদের গ্রামে আরও দু`দশটা থাকত, তাহলে শুধু দুধ বেচেই আমরা বড়লোক হতে পারতাম!
সুতরাং পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য তারা গ্রামের একটি স্বাস্থ্যবান ষাঁড় নিয়ে আসল। দুটিকে মেলামেশা করাতে পারলে নিশ্চয়ই অসংখ্য দুগ্ধবতী গাভীন পাওয়া যাবে। সে মোতাবেক একদিন তারা ষাঁড়টিকে ঐ গাভীর গোয়ালে ঢুকিয়ে দরজা আটকিয়ে দিয়ে ‘আর কটা দিন সবুর করো, রসুন বুনেছি’ গান গাইতে গাইতে দিন কাটাতে লাগলো আর গোয়াল ঘরের ভেতর তীক্ষ্ম নজর রাখতে লাগলো। কিন্তু, বিধি বাম!

গ্রামের লোকজন দেখতে পেলো, তাদের এতদিনের শান্ত গাভীটি ওই সুপুরুষ ষাঁড়টিকে মোটেই কাছে ঘেঁষতে দিচ্ছে না। ষাঁড়টি যতই চেষ্টা করুক, গাভীটিকে সে কোনক্রমেই প্রলুব্ধ করতে পারছে না। দিনের পর দিন গাভীটি তার সমস্ত কলাকৌশল ব্যর্থ করে দিতে লাগলো। আত্মসম্মানী ষাঁড়টি ক্রমাগত এই অপমান সহ্য করতে না পেরে মনমরা হয়ে গোয়ালঘরের এক কোনে খড়ের উপর মনমরা হয়ে বসে থাকতে লাগলো। গ্রামের লোকজন হায় হায় করে উঠলো!

কী করা যায়! কী করা যায়! নানা শলাপরামর্শের পর তারা ঠিক করল শহর থেকে একজন অভিজ্ঞ পশু ডাক্তার এনে গাভীটিকে দেখাবে। সে মোতাবেক শহর থেকে একজন পশু ডাক্তার আনা হলো
- কী সমস্যা তোমাদের গাভীর?
- ডাক্তার সাহেব। গাভীটি ষাঁড়টাকে কাছেই ঘেঁষতে দিচ্ছে না। ষাঁড়টি যদি গাভীর পেছন দিয়ে আগানোর চেষ্টা করে, তবে সে সামনের দিকে হাঁটা দেয়। আর যদি সামনে দিয়ে আক্রমণের চেষ্টা করে, তবে গাভীটি পেছনে দুই পা সরে আসে। আবার যদি কৌশলে একপাশ দিয়ে এগিয়ে তাকে ল্যাং মেরে শোয়ানোর চেষ্টা করে, তবে দুষ্ট গাভীটি সুকৌশলে অন্যপাশে সরে যায়। বলেনতো ডাক্তার সাহেব, আমাদের গাভীটার সমস্যাটা কী?

বৃদ্ধ ডাক্তার এতক্ষণ চোখ বুঁজে মনযোগ দিয়ে গ্রামবাসীর কথা শুনছিলো। সব কথা শুনে উনি কিছুক্ষণ ধ্যানমগ্ন হয়ে রইলেন। তারপর চোখ খুলে খুব শান্ত গলায় বললেন
- তোমরা গাভীটা কি বিরামপুর গ্রাম থেকে কিনেছো?
গ্রামবাসী একেবারে হতভম্ব হয়ে গেল। তারা একবারওতো গাভীটাকে কোন গ্রাম থেকে কেনা হয়েছে তা উচ্চারণ করেনি! ডাক্তার তাহলে জানলো কিভাবে? তাদের এই প্রশ্নের জবাবে ডাক্তার তার ব্যাগ গুছাতে গুছাতে দীর্ঘনিঃশ্বাস ছেড়ে শুধু বললো
- আমার বৌয়ের বাড়িও যে বিরামপুর। `

ইন্সপেক্টর ফজলু তার গল্পটা শেষ করে চুপচাপ বসে রইলো। আমি যেন হঠাৎই তার গল্পের অন্তর্নিহীত অর্থ ধরতে পেরে বোকার মতোই চিৎকার করে উঠলাম
- তার মানে.. তার মানে, আপনার স্ত্রীর বাড়িও কি ঐ ভদ্রলোকের স্ত্রীর বাড়ি যেখানে, সেখানেই????
ফজলু সাহেব জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে বাতাসে শুকনো পাতার ওড়াওড়ি দেখতে থাকলেন।
(একটি বিদেশি গল্পের ছায়া অবলম্বনে)

লেখক : অতিরিক্ত পুলিশ সুপার

পিডি

নতুনসময়.কম এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আপনার মন্তব্য লিখুন: