৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৫, সোমবার ২১ মে ২০১৮, ১:২৪ পূর্বাহ্ণ
bangla fonts
facebook twitter google plus rss
Natun Somoy logo

কোটা সংস্কার আন্দোলন ও আমার কিছু কথা


১৮ এপ্রিল ২০১৮ বুধবার, ০৭:১৫  পিএম

নতুনসময়.কম


কোটা সংস্কার আন্দোলন ও আমার কিছু কথা
কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী ও আইসিটি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহ্‌মেদ পলকের পাশে লেখক

সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কার আন্দোলনের সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি স্যারের বাসভবনে হামলাকারী ও সাধারণ আন্দোলনকারীদের সম্পর্কে মহান সংসদে দেয়া মতিয়া (কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী) আপার ভাষণ আমি শুনেছি, বুঝেছি। তারপর এক অনুষ্ঠানে দেখা হওয়ার পর আরো অনেক কিছু জেনেছি যা সামনা-সামনি না হলে হয়তো জানা সম্ভব হতো না। সব শুনে আমার কখনও মনে হয়নি তিনি ভুল করেছেন বা ভুল বলেছেন। গুজবে ভরা একটা কর্মকাণ্ড কিভাবে ভালো ছেলে-মেয়েদের উত্তেজিত করে তোলে তা আবারও চাক্ষুষ করলাম।

এটা কি প্রাণের দাবি ছিল?
এমন ঘটনা ফেব্রুয়ারি ২০১৪-তে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়েও (রাবি) দেখেছি। সান্ধ্যকালীন কোর্স বাতিলের দাবিতে হাজারো শিক্ষার্থী আন্দোলনে নামেন বাম ছাত্র সংগঠনগুলোর নেতৃত্বে। ছয়জন নিহত হয়েছেন বলে গুজব ছড়িয়ে রাবির প্রিয় হলগুলো ভেঙেচুরে আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়। অবশ্য পরের চার বছর সেই দাবিগুলো নিয়ে টুঁ শব্দটিও কোন আন্দোলনকারী করেননি। কেমন যেন বেমালুম ভুলে গেলেন তাদের প্রাণের দাবির কথা। এটা কি প্রাণের দাবি ছিল? নাকি ২৭ দিনের নতুন সরকারকে বিব্রত করা, পারলে পতন ঘটানোর আন্দোলন ছিল, তা আজ সহজেই অনুমেয়।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে যখন বর্ধিত বেতন ফি কমানো ও সান্ধ্যকালীন কোর্স বাতিলের আন্দোলন সংগঠিত হতে থাকে তখন আমি কেবল ৬ মাস দায়ীত্ব পালন করেছি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সভাপতি হিসেবে। ২০১৩ সালের ২২ জুলাই আমি ও তুহিন রাবি ছাত্রলীগের দায়িত্ব নেবার দিনই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিবির সভাপতি ইমন আমাদের কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক নাজমুল ভাইকে ফোন করে তুহিনকে হত্যার হুমকি দেন। সে সময় সদ্য সম্মেলন শেষ করে একই ট্রেনে ঢাকায় ফিরছিলেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর একান্ত সহকারী সচিব-২, আমাদের রাবি ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক সাইফুজ্জামান শিখর ভাই। তিনি তাৎক্ষনিক রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার মনিরুজ্জামান সাহেবকে ফোন করে শিবির সভাপতির ফোন নম্বর ট্র্যাক করার অনুরোধ করলে মনিরুজ্জামান সাহেব বলেন শিবিররা মোটরসাইকেলে চলন্ত অবস্থায় ফোনে হুমকি দিয়েছেন ও এক নম্বর একবারের বেশি ব্যবহার করা হয়নি বা করছে না। তখন প্রযুক্তি এতো উন্নত না থাকায় তাদের অবস্থান সনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। যাহোক নেতৃত্ব পাওয়ার এক মাস পর ২২ আগস্ট তুহিনের ওপর শিবির হামলা করে হাত পায়ের রগ কেটে দেয়। এমনকি নৃশংসতার স্বাক্ষর রাখতে ও ভীতি ছড়াতে তার ডান হাতের তর্জনী কেটে নিয়ে যায় ওরা। তুহিনের অনুপস্থিতিতে পুরো চাপ আমাকে সামলাতে হয়। আমার এসএম হলের সভাপতি মামুনকে হত্যা করা হয়, যার কিনা পরদিন বাংলাদেশ পুলিশের উপ-পরিদর্শক পদে যোগদানের কথা। হামলা করে আমার সাংগঠনিক সম্পাদক সাদ্দামের হাত পায়ের রগ কেটে দেয়া হয়। কোপানোর এক পর্যায়ে সাদ্দাম পাশের ড্রেনে পড়ে গেলে তাকে বর্ষা দিয়ে ফুঁড়ে ড্রেন থেকে তুলে আবার কোপানো হয়। সাদ্দমের ফুসফুস ক্ষতবিক্ষত হয়ে যায়। আল্লাহর অশেষ দয়ায় সে যাত্রায় সাদ্দাম প্রাণে বাঁচে। এরপর হামলা চালানো হয় আমার মিছিলে। বোমার আঘাতে লুটিয়ে পড়ে ক্রীড়া সম্পাদক লিংকন, উপ-প্রচার সম্পাদক শুভ্র, কাজলার সোহেল ভাইসহ অনেকে। আমার শরীরে আজো বিধে আছে সেদিনের বোমার সেই স্লিন্টার। আজকের রাবি ছাত্রলীগের সুদক্ষ সাধারণ সম্পাদক ফয়সাল আহমেদ রুনু তখন সাংগঠনিক সম্পাদক ছিলেন সেই মিছিলের শেষ ভাগের দায়িত্বে। তিনি-ই প্রথম হামলাকারীদের দেখতে পেয়ে চিৎকার করে সবাইকে সাবধান করেন, প্রতিরোধ গড়তে সর্বপ্রথম তৎপর হন, পরে সবাই মিলে হামলা প্রতিহত করি আর সেই তৎপরতায় বেঁচে যায় কিছু তাজা প্রাণ। এরপর হত্যা করা হয় আমার আরেক হল সভাপতি রতনকে। যাকে একবার প্রকাশ্যে আরডিএ মার্কেটের সামনে পেট ফেঁড়েও শিবিরের খায়েশ মেটেনি। এরকম হাজারো যুদ্ধ শেষে যখন ৫ জানুয়ারি নির্বাচন হলো, তারপর শুরু আরেক ষড়যন্ত্র। যে বাম ছাত্রসংগঠনের নেতাদের হাতে পায়ে ধরে নির্বাচনের পূর্বে হলে তোলা যায়নি, তারা হলে উঠতে শুরু করলেন। গোপনে বৈঠক শুরু করলেন শিবির ছাত্রদলের সদ্য বেকার হওয়া নেতাকর্মীদের সঙ্গে। আগের দাবিগুলো আন্দোলনে রূপ নিল নিমিশেই। আমি আন্দোলনরত বাম নেতাদের সঙ্গে ৭-৮ বার বৈঠকে বসেছি। তাদের দাবিগুলোর সঙ্গে সমর্থন জানিয়ে এক সঙ্গে আন্দোলন করতে চেয়েছি। তারা ছাত্রলীগকে সে আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হতে দেয়নি। তাই বাধ্য হয়ে একই দাবি নিয়ে আমরা সমান্তরাল আরেকটি আন্দোলন গড়ে তুলতে বাধ্য হই। পহেলা ফেব্রুয়ারি ২০১৪ বামদের সঙ্গে শিবির-ছাত্রদলের ‘গোপন কর্মীরা’ (যারা গা ঢাকা দিয়ে থাকেন) সাবাস বাংলার মাঠে সমাবেশ শুরু করেন। সেদিন বর্ধিত ফি ও বেতন প্রত্যাহারের ঘোষণা আসলে পরদিন আমরা আনন্দ মিছিলের কর্মসূচি ঘোষণা করি। হঠাৎ কোন পূর্ব ঘোষণা ছাড়াই ২ ফেব্রয়ারি ২০১৪ বামদের নেতৃত্বে শিবির-ছাত্রদল অংশ তাদের পূর্ব নির্ধারিত সাবাস বাংলার মাঠ ছেড়ে আমাদের মিছিলের রাস্তা ও প্রশাসন ভবনের মুল ফটক বন্ধ করে অবস্থান নেয়। এতে কিছুটা উত্তেজনা তৈরি হলেও কোন অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। কিন্তু আমাদের মিছিল তাদের অবস্থান পার হয়ে ১০০ মিটারের বেশি পথ অতিক্রম করার পর আমাদের মিছিলের পেছন দিকে বোমা হামলা হয়। তারপর আমি অপর অংশের আন্দোলনকারীদের থামাতে সামনে এগিয়ে গেলে তারা আমার ওপর হামলা চালান।

হামলা শুরু হয়ে গেলে আমার সামনে দুটো পথ খোলা ছিল- এক পালিয়ে যাওয়া অথবা হামলা কারীদের পালাতে বাধ্য করা। আমি ছাত্রলীগ রা বির সকল নেতাকর্মীর নিরাপত্তার কথা ভেবে দ্বিতীয় পথ বেছে নেই। আমি সংঘর্ষ চাই নি,সেটা ক্যাম্পাসে থাকাকালীন অনেক বক্তব্যেই বলেছি।আজো বলছি।তবে আমার দায়ীত্বের থাকা ছাত্রলীগের উপর কেউ হামলা করবে আর আমি হাত গুটিয়ে বসে থাকব,এমন বাবার সন্তান আমি নই।যদি আত্মরক্ষা আমার অপরাধ হয় তবে সে অপরাধ আমি আমৃত্যু করতে চাই।

আজ আমি আমার তৎকালীন নেতা কর্মী নিয়ে গর্বিত। এত বড় একটা আন্দোলন, এত বড় ধ্বংসযজ্ঞ সেই সময়ে আমার সহ-সভাপতি সরকার ফারহানা আক্তার একাই মুন্নুজান হলে থাকত।হাজারো ছাত্রী সংস্থার ভিড়ে ও এক ছাত্রলীগ নেতা যে মাথা উঁচু করে হলে থাকত।কোন ছাত্রীসংস্থা তার গায়ে হাত তোলা তো দুরের কথা চোখে চোখ রেখে কথা বলার সাহষ পায় নি।আর জুতার মালা! ভুমিকম্প হয়ে যেত রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে, কারন ফারহানার ১৯ জন ভাই তখনও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগ করার জন্য বেঁচে ছিল।আর ফারহানার শরীরে ছিল ৭১ এর রনাঙ্গনে লড়াই করা এক বীর মুক্তিযোদ্ধার রক্ত। এবার আসি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্দোলনের বিষয়ে।

আহবায়ক মামুনের একটা বক্তব্য শুনলাম সে বলছে" মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আমাদের মমতাময়ী মা দেশনেত্রী শেখ হাসিনা।সে নাকি কোন হলে ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি।আশ্চর্য হয়ে যাই এক জন ছাত্রলীগ নেতা দেশনেত্রী ও দেশরত্নের পার্থক্য বোঝে না অথচ সে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলের মত একটা জায়গার ছাত্রলীগের নেতা হয় কিভাবে?ওদের(আন্দোলনকারী) নেতাদের বক্তব্যের একটি বাক্য শেষ হলেই সবাই সমস্বরে চিৎকার করে বলছে "ঠিক" এটা কাদের ষ্টাইল?না জানলে আজই ইউ টিউবে শিবিরের পথসভার বক্তব্যগুলো দেখুন।

সবচাইতে বড় ব্যাপার যেটা ৪ বছর আগে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে যেমনি মৃত্যুর গুজব ছড়িয়ে হলগুলো তছনছ করা হয়েছে এখানেও তাই। আর মতিয়া আপা রাজাকারের বাচ্চা বললের ভিসির বাসভবনে হামলাকারীদের কিন্তু আন্দোলনকারীগন এটা নিজের ঘাড়ে তুলে নিলেন কেন?
তাদের এত লাগল কেন?
তবে কি ঠাকুর ঘরে কে রে
আমি কলা খাই না জাতীয় কিছু?
সবশেষে সবচাইতে জঘন্য ঘটনা নিয়ে কিছু বলতে চাইঃ সুফিয়া কামাল হল ছাত্রলীগের সভাপতি এশাকে যে বিবস্ত্র করা হল জুতার মালা পরানো হল,আপনার কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ বা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগ কি করলেন? এত দুর্বল আপনারা যে বোনের সম্ভ্রম রক্ষা করতে পারেন না?
এশার দোষ ছিল জানি কিন্তু সেগুলোর জন্য সাংগঠনিক ব্যাবস্থাই যথেষ্ট নয় কি?নাকি বিবস্ত্র হওয়াটাও তার শাস্তির মধ্য পড়ে?
সবশেষ কথা এশারা আর কোনদিন বাংলাদেশ ছাত্রলীগের কোন ইউনিটের দায়ীত্ব যেন না পায় কারন যে সভাপতির রুমের জানালায় তার সহ-সভাপতি লাথি মারে তার বিরাট অপরাধ এই রকম কাউকে সহ-সভাপতি বানানো।তাছাড়া এমন নেতৃত্ব প্রত্যাশা করি শারীরিক নির্যাতনে চোখে পানি আসতে পারে,অপমানের ভয়ে নয়।সেদিন যদি এশা মাথা উঁচু করে নির্যাতন সহ্য করত,চোখে অশ্রু নয় আগুন থাকত তবে ভাই হিসেবে আমি গর্বিত হতাম।

যদি সেদিন কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ পালানোর বদলে জীবন দিত, আমি হয়ত কাঁদতাম তবে যতদিন বাঁচতাম মাথা উঁচু করে বাঁচতাম, যেমনটি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগ করে।

লেখক: মিজানুর রহমান রানা
সাবেক সভাপতি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগ

নতুনসময়.কম এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আপনার মন্তব্য লিখুন: