৩০ শ্রাবণ ১৪২৫, বুধবার ১৫ আগস্ট ২০১৮, ৩:০২ পূর্বাহ্ণ
bangla fonts
facebook twitter google plus rss
Natun Somoy logo

এখনো আশা করি, সেই দিনগুলো ফিরে আসবে


১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৭ মঙ্গলবার, ০৬:৪৫  পিএম

চিত্তরঞ্জন দেবনাথ চিত্ত

নতুনসময়.কম


এখনো আশা করি, সেই দিনগুলো ফিরে আসবে

গল্পটা মায়ের কাছে থেকে শোনা।
নব্বই দশকের প্রথম দিকের ঘটনা। আমার তখন হামাগুড়ির বয়স। সারা দেশেই তখন মোটামুটি অভাব চলছে, খাবারের অভাব- কাজের অভাব। আমার বাবা একজন সামান্য তাঁতী ছিলেন। যুদ্ধের সময় হিন্দুদের কাঁটাতার পেরুনোর যে স্রোত ছিল সেটা তখনো মন্দাকারে চলতে ছিল, আমাদের স্বজনদের অনেকেই চলে গেছেন ওপার বাংলায়।

আমাদের গ্রামে যদিও যুদ্ধের প্রভাব পড়েনি এবং কোনো সাম্প্রদায়িক কোনো দুর্ঘটনাও ঘটেনি। সে সময় বাবাও ত্রিপুরায় আমাদের এক আত্বীয়ের বাড়িতে গিয়েছিলেন ভালো কোনো কাজের সন্ধানে। এদিকে আমাদের পরিবারে উপার্জন করার মতো তেমন কেউ ছিল না। আমার বড় দিদি, বড়দা আর মা কোনো রকমে সংসারটা চালাতেন। বাবা প্রায় তিন মাস ছিলেন আগরতলা।একটা কাজের ব্যবস্থাও হয়েছিলো। এদিকে প্রতিবেশী হিন্দু মুসলিম সকলের সহযোগিতায় আমাদের পরিবার চলে যাচ্ছিল অনেক টানাপোড়নের মধ্য দিয়ে।

এখানে একটি কথা বলে রাখা দরকার যে আমার বাবা অত্যন্ত বন্ধুবৎসল মানুষ ছিলেন, গ্রামে ওনার একটা ভালো সুনাম এবং গ্রহনযোগ্যতা ছিল হিন্দু মুসলমান দুই সমাজেই। এখনো হিন্দু সমাজের তুলনায় বাবা মুসলমান সমাজে বেশ ভালো সমাদর পেয়ে থাকেন। তো পরমপরার মতো বাবার মুসলমান বন্ধুর ছেলেদের সাথে আমারও সখ্যতা, বন্ধুত্ব গড়ে উঠে।

তারপর একদিন বাবা আসলেন দেশে তিনমাস পর। মোটামুটি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন ওপারে চলে যাবেন। আমাদের বসতভিটা ছাড়া আর কোনো জমি ছিলো না। বাবা লোকদের সাথে আলাপ করলেন ওপারে যাওয়ার ব্যাপারে- বাড়ি বিক্রির ব্যাপারেও।

এমন অবস্থায় বাবার ঘনিষ্ঠ কিছু মুসলামান বন্ধুর সাথে আলাপ করলেন এই ব্যাপারে। ওনারা বাবাকে বুঝালেন- এতোগুলা ছেলে-মেয়ে নিয়ে তুই ভারত গিয়ে কিভাবে কি করবি? এখনো তোর ছেলে-মেয়েরা কাজের উপযুক্ত হয়নি।

ফরিদ কাকা বলেছিলেন, দেখ শ্যামা (বাবার নাম শ্যামাচরন দেবনাথ) এইদেশে তুই যখন খুব অভাবে পড়বি, তোর ঘরে চাল, ডাল থাকবে না তখন যদি আমার মায়ের কাছে এসে বলিস আমার মা ঠিকই একটা ব্যবস্থা করে দিবে। কিন্তু সেদেশে গেলে কার কাছে যাবি? কেইবা তোকে সাহায্য করবে বল?

এরকম আরো অনেকেই বাবাকে পাশে থাকার কথা দিয়েছিলেন- পাশে ছিলেনও সহযোগিতাও করেছেন। বাবার বন্ধুদের অনেকেই এখন নাই।

কাছের কয়েকজনের কথা আমার মনে আছে- কাশেম স্যার, বোরখান স্যার, ফরিদ চাচা, কাইয়ুম স্যার, কালু কাকা, রউফ মিয়া কাকা এরকম আরো অনেকে।

এরপর আগরতলা যাওয়ার চিন্তা থেকে সরে আসলেন। সিদ্ধান্ত নিলেন এদেশে থেকেই যা করার করবেন। বাবা আর কোনোদিন ঐপারে যাওয়ার কথা ভাবেননি। তাঁতের ব্যবসা করেই আমাদের ছয় ভাই-বোনকে মানুষ করলেন আমরাও কষ্ট করে পড়াশুনা করেছি।

কিন্তু এখন আর আগের মত সম্প্রীতির চিত্র চোখে পরে না। ফরিদ চাচা কিংবা বোরখান স্যারের মত বন্ধুও আমাদের এখন নেই- নেই সেই সম্প্রীতির সম্পর্কও। বাবার তখনকার ভারত না যাওয়ার সিদ্ধান্তে এখন আমরা মাঝে মধ্যে বাবাকে দোষারোপ করি। জানি না আমরা ঠিক করি কিনা? বাবাও এদেশে আমাদের ভবিষ্যৎ ভেবে ক্লান্ত হন।

এখন আমরা যে গ্রামে থাকি সেখানে দুচারটি অপ্রীতিকর ঘটনা ছাড়া বড় কোনো ঘটনা ঘটেনি। তারপরও আমাদের কেন জানি মনে হয় আমরা দুর্বল, চাইলেও অনেক কিছু বলতে পারি না, করতে পারি না। নিজেদের কেমন যেন রিফিউজি মনে হয় যখন কেউ সংখ্যালঘু বলে। ধর্মীয় উৎসবের আয়োজন করতে হয় অনেককিছু ভেবেচিন্তে।

এতকিছুর পরেও আমরা ঐপারে যাওয়ার কথা ভাবি না। এখনো আশা করি সেই দিনগুলি ফিরে আসবে- বোরখান স্যার কাশেম স্যাররা ফিরে আসবেন আমার বন্ধু হয়ে।

[সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গঠনের লক্ষ্যে সচেতনতামূলক ক্যাম্পেইনের অংশ হিসেবে প্রকাশিত] 

https://www.facebook.com/HumaneFirst/ 

 

আরো পড়ুন 

নতুনসময়.কম এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আপনার মন্তব্য লিখুন: