১৪ আষাঢ় ১৪২৪, বুধবার ২৮ জুন ২০১৭, ১১:২২ অপরাহ্ণ
bangla fonts
facebook twitter google plus rss
Natun Somoy logo

গল্প

এক পা বাড়ালেই...


১৯ জুন ২০১৭ সোমবার, ১২:৪২  পিএম

তাহমিনা শাম্মী

নতুনসময়.কম


এক পা বাড়ালেই...

সমুদ্রের খুব কাছে দাঁড়িয়ে আছি; ঠিক ততটা কাছে, যতটা কাছে গিয়ে আর এক পা বাড়ালেই বুকের কাছে চলে যাওয়া যায়। নিচে গভীর খাঁদ। সমুদ্রের ঠাণ্ডা হাওয়া হৃদয় পর্যন্ত ভিজিয়ে দিচ্ছে। কখনো কখনো বাতাসের প্রচণ্ড ধাক্কায় সমুদ্রের জল ছিটে এসে মুখে লাগছে।

বাতাসের শো শো আওয়াজে সমুদ্রের কান্নার সুর শুনতে পাচ্ছি, কিছুক্ষণ আগে অমন একটা সুর আমার প্রানেও উঠেছিলো, কিন্তু কেনো জেনো এই মুহূর্তে নিজেকে একেবারেই শুন্য মনে হচ্ছে, অনেকটা অনুভূতিহীন। এখানটায় সমুদ্রের স্রোত এত বেশি যে, একবার পড়লেই সে তার বুকে টেনে নিতে একমুহূর্ত সময় নেবে না। আমি বেশ ভালো সাঁতার জানি। কিন্তু ঠিক বুঝতে পারছি, একবার কাছে পেলে সে আমার সাঁতার কসরতের কোনো মর্যাদাই সে দেবে না। যদিও ওড়না দিয়ে আমার হাতের সাথে অর্কের হাত ছয়টা গিঁট দিয়ে বাঁধা। কিন্ত তারপরেও ও আমার হাতটা শক্ত করে ধরে আছে।

আমাদের প্রেমের বয়স ছয় বলে ওড়নায় ছয়টি গিঁট দিয়েছি। প্রথম কাছাকাছি আসার সময় বিষয়টা খুব একটা মাথায় আসেনি আমাদের। আমি যদিও দু-একবার বলেছি, অর্ক সেটাকে যুক্তি দিয়ে উড়িয়ে দিয়েছে। আমরা একে অপরকে হৃদয় দিয়ে উপলব্ধি করেছি। সবকিছুর ওপরে গিয়ে মানবতাকে ও মানবধর্মকে বিশ্বাস করেছি। ধর্ম-বর্ণের ওপরে গিয়ে সাধ্যমতো মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছি। পাশাপাশি থেকে প্রণয়ে, অভিমানে, বিশ্বাসে, স্বপ্নে, ঝগড়ায়, আমরা একটা দীর্ঘপথ পাড়ি দিয়ে এসেছি। ও ওর বাবা-মায়ের একমাত্র ছেলে। আমিও আমার পরিবারে তাই। আজ এ সময় এসে আমরা দুজনেই বুঝতে পেরেছি, বাবা-মাকে কিছুতেই কষ্ট দেওয়া যায়না। তাই, আমারা বিনাযুদ্ধে সমুদ্রে হারিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি!

প্রথম বাধাটা অবশ্য আমার পরিবার থেকেই এসেছিল। মাকে বলতেই সে সোজা বলে দিলো, ‘তোর আব্বু শুনলে সাথে সাথে হার্ট অ্যাটাক করে মারা যাবে। এ কথা আর দ্বিতীয়বার মুখে আনবি না’। মা তো বলে দিলেই হলো! মনকে মানাবো কী দিয়ে! আবেগকে ফেরাবো কী দিয়ে! তাই গোপনেই চলছিল।

এরপর অনেকটা সময় গড়িয়ে গেছে। এখন যথেষ্ট বয়স হয়েছে বলে আত্মীয়-স্বজন পাত্রের সন্ধান দিতে শুরু করে দিয়েছে। ওদিকে কে বা কারা অর্কের মায়ের কাছেও সংবাদখানা পৌঁছে দিয়েছে। সেটা নিয়েই ওদের বড়িতে হাঙ্গামা। মুসলিম মেয়েকে কিছুতেই বউ করা যাবে না। তাদের রীতিনীতির সাথে কিছুতেই মানাবে না। ওর মা রীতিমতো অসুস্থ হয়ে পড়েছে। পরিস্থিতিটা এমন যে, আমারা বুঝে গেছি, আর একসাথে বেঁচে থাকা আমাদের পক্ষে সম্ভব না। তাই এই পথ! যদিও পর্যাপ্ত প্রাপ্তবয়স্ক দুজন মানুষের এমন হঠকারী সিদ্ধান্ত নেওয়া মানায় না। কিন্ত একেবারে পরিকল্পনাবিহীন এমন একটা সিদ্ধান্ত আমরা নিয়েছি।

আমরা প্রায় দুই ঘণ্টা যাবত এখানে দাঁড়িয়ে আছি। এর মধ্যে দুটো ডলফিন এসে পিঠ উঁচিয়ে আমাদের দেখে গেছে। লাল কাঁকড়াগুলোও এখন আমাদের আর ভয় পাচ্ছে না। সময়মতো নিজের রঙ বদলে নিয়েছে প্রকৃতি। প্রথমে অর্ককে বেশ সাহসীই মনে হচ্ছিল। কিন্তু এখন বেশ বুঝতে পারছি, ওর হাত কাঁপছে। বাতাসে আমার চুলগুলো উড়ে গিয়ে ওর মুখমণ্ডল গ্রাস করে নিয়েছে। ও চোখ বন্ধ করে শুধু ভেবেই যাচ্ছে। আমি জানি, ও খুব ক্যালকুলেটিভ ছেলে। শেষ পর্যন্ত কোনো আবেগী সিদ্ধান্ত সে নেবে না।

আমি ওকে বিশ্বাস করি। আজ এই সমুদ্রের ধারে বাতাসের সাথে মিশে যাওয়া প্রশ্বাসগুলোই যদি শেষ প্রশ্বাস হয়, তাহলে এটাই পৃথিবীর জন্য ভালো। আমারা কখনোই শুধু নিজেদের চিন্তা করিনি। তাই, ভাবনার কাজটা এখন আর আমি করছি না। আমি সবকিছুর জন্যেই প্রস্তুত ‘এক পা বাড়াতেও...`

ওর হাতটা আমার হাতের সাথে বেশ ভালোভাবেই বাঁধা আছে। তা সত্ত্বেও ও আমার হাতটা শক্ত করে ধরে আছে। সিদ্ধান্তটা ওরই ছিল। কিন্তু বেশ বুঝতে পারছি, কাজটা যতটা সহজ ভেবেছিল, ঠিক ততটা সহজ না, তবে আমি নিশ্চিত, অর্ক মৃত্যুকে ভয় পাচ্ছে না।

সূর্য লাল রঙ ধারণ করে জলের খুব কাছাকাছি চলে এসেছে। যেকোনো সময় জলের তলে ডুবে যাবে। তাই ওকে তাড়া দিয়ে বললাম, ‘কি রে আর কত সময় দাঁড়িয়ে থাকবো?’ ও মুখে থেকে চুলগুলো সরিয়ে আমার কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করে বললো- ‘আর কোনো পথ নেই!`মা যে বড় কষ্ট পাবে!’ আমিও বুঝলাম, বাবা খুব কষ্ট পাবে!

আমার কাছে কোনো উত্তর নেই। তাই, একটা একটা করে ছটি বাঁধনই খুলে ওড়নাটা ফের গায়ে জড়িয়ে নিলাম। সমুদ্র মহান! নারীও তো সমুদ্র! সমুদ্রের মতো আমিও সবকিছু ধারণ করে নেবো। জীবনের উদ্দেশ্য বৃহৎ! বেঁচে থেকে সেই পথের সন্ধান দিতে হবে আরো অনেককে। আমি আমার মুক্ত দুটি হাত বাড়িয়ে দিয়েছি সমুদ্রের দিকে। আমার ভেতরে এখন আর কোনো যন্ত্রণা নেই! কোনো ক্লেদ, হিংসা কিচ্ছুটি নেই! সমুদ্র থেকে উঠে এসে কোনো এক অদৃশ্য শক্তি আমাকে জড়িয়ে ধরেছে! আমিও তার বুকে নিজেকে সমর্পণ করেছি।

আরো কিছু সময় দাঁড়িয়ে থেকে কিছু এলোমেলো হিসাব নিয়ে পিচঢালা পথের দিকে হাঁটতে শুরু করলো অর্ক রায়। হাঁটতে হাঁটতে এতদূর চলে গেল যে, আর এক পা বাড়ালেই সমুদ্র আমার সীমানা ছাড়িয়ে...!

নতুনসময়.কম এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আপনার মন্তব্য লিখুন: